

নিজস্ব সংবাদদাতা
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, গ্রেপ্তার হচ্ছে খুচরা কারবারি ও বাহকরা, উদ্ধার হচ্ছে হেরোইন-ইয়াবা। কিন্তু মাদক সিন্ডিকেটের নেপথ্যের মূল হোতারা যেন বরাবরই অধরা। সর্বশেষ তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তারে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজির নির্দেশের পরও তিনি পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। তার বাড়িতে অভিযান চালানোর আগেই তিনি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী থানায় একাধিক মাদক ও অস্ত্র মামলা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও যশোরের কোতোয়ালি থানাতেও তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলায় হেরোইন, ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারের বিষয় উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি ‘মাদকমুক্ত থানা গড়ার লক্ষ্যে’ আয়োজিত মতবিনিময় ও কমিউনিটি পুলিশিং সভায় জাহাঙ্গীর আলমের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারিদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ওই সভায় উপস্থিত হন। মাদকবিরোধী সভায় একজন তালিকাভুক্ত মাদক কারবারির উপস্থিতির বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়।
এরপর রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। নির্দেশের পর গোদাগাড়ী পৌরসভার মাদারপুর এলাকায় তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মির্জা মো. আব্দুস ছালামের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের আগেই জাহাঙ্গীর বাড়ি থেকে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযানের খবর আগেই পৌঁছাল কীভাবে?
ডিআইজির নির্দেশের পর পুলিশ যখন একজন তালিকাভুক্ত মাদক কারবারির বাড়িতে অভিযান চালায়, তখন পুলিশের উপস্থিতির আগেই অভিযুক্তের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযানের খবর কি আগেই ফাঁস হয়েছিল? নাকি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে তিনি প্রশাসনের গতিবিধি সম্পর্কে আগাম তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন—এমন প্রশ্নও উঠেছে।
তবে পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযানের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ স্বীকার করেননি।
গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “জাহাঙ্গীর আলম থানার তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। ডিআইজি স্যারের নির্দেশে সার্কেল এএসপির নেতৃত্বে তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।”
মামলার পর মামলা, তবুও প্রকাশ্যে
পুলিশ ও আদালত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী থানায় ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৪ সালে দায়ের করা একাধিক মাদক মামলা এবং একটি অস্ত্র মামলা রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ২০১৫ সালে এবং যশোরের কোতোয়ালি থানায় ২০২০ সালে তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
একাধিক মামলায় নাম থাকার পরও তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাহাঙ্গীর আলম এলাকায় প্রকাশ্যে আসেন। এরপর তিনি গোদাগাড়ীর মাদক সিন্ডিকেটে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার বা স্বীকার করে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিপুল সম্পদের উৎস কোথায়?
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগ অনুযায়ী, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে জাহাঙ্গীর আলম বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। মাদারপুরে বিলাসবহুল বাড়ি, গরু-মহিষের খামার, একাধিক ট্রাক, রাজশাহী শহরে ফ্ল্যাট, জমি ও অন্যান্য সম্পদের মালিকানার কথা স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একসময় সীমিত আয়ের ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত একজন মানুষের এত বিপুল সম্পদের উৎস কী? এসব সম্পদ কি বৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত, নাকি মাদক ব্যবসার অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে—এ বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে শুধু অভিযান চালিয়ে বাহক বা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। মাদকের অর্থের উৎস, সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি ও পরিবহন খাতের বিনিয়োগ—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
পরিবার ঘিরেও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
জাহাঙ্গীর আলমের বাবা নওশাদ আলী এবং ভাই আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। তাদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নওশাদ আলী ও আলমগীর হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছোট কারবারি গ্রেপ্তার, বড় কারবারিরা অধরা
গোদাগাড়ীতে প্রায়ই হেরোইন ও ইয়াবা উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় বাহক, খুচরা বিক্রেতা ও মাদক পরিবহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও মাদক সিন্ডিকেটের অর্থদাতা ও নেপথ্যের মূল নিয়ন্ত্রকদের অনেকেই থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক ব্যবসার বড় চালান ধরা পড়লেও মামলায় মূল হোতাদের নাম খুব কমই আসে। ফলে গ্রেপ্তার হওয়া বাহকরা জামিনে বেরিয়ে এলে আবারও একই সিন্ডিকেটে যুক্ত হচ্ছে। আর নেপথ্যের কারবারিরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
মাদকবিরোধী সভায় তালিকাভুক্ত মাদক কারবারির উপস্থিতি, ডিআইজির নির্দেশের পর অভিযান এবং অভিযানের আগেই তার পালিয়ে যাওয়া—এই তিনটি ঘটনায় গোদাগাড়ীর মাদকবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি যদি প্রশাসনের নজরদারির মধ্যে থেকেও প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারেন, মাদকবিরোধী সভায় উপস্থিত হতে পারেন এবং পুলিশের অভিযানের আগেই পালিয়ে যেতে পারেন—তাহলে মাদকবিরোধী অভিযানের নেপথ্যে কোনো দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে কি?
সচেতন মহলের দাবি, জাহাঙ্গীর আলমকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো পুনঃতদন্তের পাশাপাশি তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত অর্থদাতা, সহযোগী, পৃষ্ঠপোষক ও প্রশাসনের ভেতরের কোনো সহযোগিতা থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
তবে পুলিশ বলছে, জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন দেখার বিষয়—ডিআইজির কঠোর নির্দেশের পরও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই কথিত মাদক সম্রাটকে শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়, নাকি গোদাগাড়ীর মাদক সিন্ডিকেটের অন্য অনেক রাঘব বোয়ালের মতো তিনিও থেকে যান অধরাই।
আপনার মতামত লিখুন :