

নিজস্ব সংবাদদাতা
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে শয্যা না পেয়ে আরও ৩৩ শিশু অপেক্ষামান রয়েছে। গতকাল দুপুর ২ টা পর্যন্ত এসব শিশুকে আইসিইউতে ভর্তির জন্য নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে শয্যা না থাকায় তাদের ভর্তি করা যায়নি।
এদিকে, এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের মধ্যে হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। রাজশাহী বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মাসে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্তত ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পরও ৯ জন মারা গেছে। সর্বশেষ গত শনিবার (২৮ মার্চ) আরও তিন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় শিশু বিভাগের ১৫৩ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হলে ৪৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়। এতে আক্রান্তের হার দাঁড়ায় প্রায় ২৯ শতাংশ। সংক্রমণের দিক থেকে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক।
গত ১ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে ৮৪ জন হামের রোগীকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এদের মধ্যে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকা আরও তিন শিশুও প্রাণ হারায়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সম্প্রতি আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হামে আক্রান্ত চার শিশুর মধ্যে গত শুক্রবার সকালে মারা যায় তিনজন। বর্তমানে আরও কয়েকজন শিশু গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
জেলার মোহনপুর উপজেলার শিশু আদিবের বাবা জানান, তার ছেলে নিউমোনিয়া ও হামে আক্রান্ত হয়েছে। তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে তিন দিন পরে। কুষ্টিয়ার মীরপুরের ১০ মাস বয়সী শিশু সাফোয়ানও আক্রান্ত নিউমোনিয়া এবং হামে। তাকে গত শনিবার আইসিইউতে ভর্তি করার কথা বলা হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত সাফোয়ানকে ভর্তি করানো যায়নি শয্যা না
রাজশাহী নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার ৮ মাস বয়সী আব্দুল্লাহকে ভর্তি করা হয় নিউমোনিয়ার কারণে। আইসিইউতে সুপারিশ করার তিনদিন পরে গত শুক্রবার তাকে নেয়া হয় আইসিইউতে। তার নানী সীমা বেগম বলেন, এখনো বাচ্চা অবস্থা খারাপ। আগেই আইসিইউতে নেয়া গেলে হয়তো দ্রুত ভালো হত। এখন কি হবে বুঝতে পারছি না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার এক অভিভাবক মোহাম্মদ ওয়াসিম জানান, তার সন্তানকে ঠান্ডা, জ্বর ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও পরে জানা যায়, সে হাম আক্রান্ত। তিনি বলেন, ওয়ার্ডে এমন অনেক শিশুই ভর্তি রয়েছে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জনবল সংকটের কারণে রোগীদের সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালের ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে অস্থায়ী আইসোলেশন কর্নার চালু করা হয়েছে।
এদিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। পাবনা সদর হাসপাতালে একদিনেই ২৬ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল। তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং দ্রুত শনাক্তকরণ ও আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
অপরদিকে, হাসপাতালের আইসিইউর একজন চিকিৎসক জানান, আইসিইউতে যেসব শিশু আসছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই আক্রান্ত নিউমোনিয়া এবং হামে।
কিছু আছে জ্বরে আক্রান্ত। রোগীর চাপ বেশি থাকায় প্রতিদিন তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলেও অন্তত ৩০-৪০ জনকে অপেক্ষায় রাখতে হচ্ছে। শয্যা ফাঁকা হওয়ার পরে সিরিয়াল অনুযায়ী পরিবারের লোকজনকে ফোন করা হচ্ছে। ততক্ষণে অনেক শিশু মারাও যাচ্ছে। এভাবে গত ১০-২৮ মে পর্যন্ত অপেক্ষামান শিশুই মারা গেছে ৫১ জন। আর চলতি মাসে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন মারা গেছে ৩৪ জন। চিকিৎসা দেয়া হয়েছে ১১০ জনের মতো শিশুকে।
আপনার মতামত লিখুন :