

লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি:
নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুরে অবস্থিত ‘আজিমনগর রেলওয়ে স্টেশন’ কেবল উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্রই নয়, এটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক রক্তস্নাত ইতিহাসেরও সাক্ষী। ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ আমলে “গোপালপুর রেলস্টেশন” নামে যাত্রা শুরু করা এই স্টেশনটির সাথে জড়িয়ে আছে এক বীর শহীদের স্মৃতি। কিন্তু গৌরবময় ইতিহাসের অধিকারী এই স্টেশনটি বছরের পর বছর ধরে তীব্র জনবল সংকটে ভুগছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে স্থানীয় হাজারো যাত্রীকে।
নামকরণ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
১৯৭১ সালের ৫ মে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে এক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালায়। সেখানে মিলের তৎকালীন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট আনোয়ারুল আজিমসহ বহু কর্মকর্তা ও শ্রমিককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে এই বীর শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাঁর স্মৃতিকে অম্লান রাখতে ১৯৭৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকার স্টেশনটির নাম পরিবর্তন করে “আজিমনগর রেলস্টেশন” নামকরণ করে।
রাজধানী ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই স্টেশনটি দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। বিশেষ করে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের মালামাল ও চিনি পরিবহন এবং ঈশ্বরদী ইপিজেডের শ্রমিকদের যাতায়াতে এই স্টেশনের ভূমিকা অপরিসীম।
বর্তমানে এই স্টেশন দিয়ে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস, সাগরদিয়াড়ী এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস, রুপসা এক্সপ্রেস, সীমান্ত এক্সপ্রেস, ধুমকেত এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস, সিলসিটি এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস, বুরুঙ্গামারী এক্সপ্রেস, নীলসাগর এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস, চিলাহাট এক্সপ্রেস সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন চলাচল ও যাত্রাবিরতি করে। তবে স্টেশনের আধুনিকায়ন ও সুযোগ-সুবিধার অভাব যাত্রী ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র জনবল (বিশেষ করে স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান) সংকটে ভুগছে আজিমনগর স্টেশন। যার কারণে বিগত ২০১৩, ২০১৭, ২০২০, ২০২১, २०२२ এবং ২০২৩ সালে স্টেশনটি বিভিন্ন মেয়াদে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে। প্রতিবারই স্টেশনটি বন্ধ হলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা। পরবর্তীতে প্রতিবারই রেলযাত্রী ও এলাকাবাসীর তীব্র আন্দোলন এবং দাবির মুখে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে স্টেশনটি পুনরায় চালু করতে বাধ্য হয়।
২০২৬ সালের এই মুহূর্তে স্টেশনটির কার্যক্রম জোড়াতালি দিয়ে চললেও স্থায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়ায় যেকোনো সময় এটি আবারও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা।
স্টেশনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী বলেন,
”আজিমনগর স্টেশন শুধু আমাদের যাতায়াতের মাধ্যম না, এটা আমাদের লালপুরের অহংকার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, একটু স্থায়ী স্টেশন মাস্টার আর জনবলের অভাবে আমাদের বারবার আন্দোলনে নামতে হয়। আমরা এই সংকটের স্থায়ী সমাধান চাই।”
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের একজন শ্রমিক জানান,
”ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে এসেও একটা ঐতিহাসিক রেল স্টেশন কেন বারবার বন্ধের মুখে পড়বে? ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো এবং স্টেশনের টিকিট কাটার ব্যবস্থা আরও সহজ করা এখন সময়ের দাবি।”
দ্রুত টেকসই সমাধানের দাবি
এলাকাবাসী ও রেলযাত্রী কল্যাণ পরিষদের দাবি—আজিমনগর রেলওয়ে স্টেশনকে আর সাময়িক বা জোড়াতালি দিয়ে নয়, বরং স্থায়ী জনবল নিয়োগ করে এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম সচল রাখা হোক। একই সাথে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং যাত্রী ছাউনির আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন লালপুরের সর্বস্তরের জনগন
আপনার মতামত লিখুন :