

নিজস্ব প্রতিবেদক জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং পায়রা বন্দরকে রাজধানীর সঙ্গে আধুনিক রেল যোগাযোগে যুক্ত করার বহুল আলোচিত ভাঙা-বরিশাল-কুয়াকাটা রেলপথ প্রকল্প বর্তমানে অর্থ সংকটের কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হলেও এখনো কোনো বড় বিনিয়োগকারী বা উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হাজারো পরিবার গত আট বছর ধরে চরম দুর্ভোগের মধ্যে জীবনযাপন করছে। বাড়িঘর ও জমিতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দেওয়া লাল নম্বরের কারণে তারা জমি বিক্রি, নতুন স্থাপনা নির্মাণ কিংবা সংস্কার করতে পারছেন না। অথচ এখনো ক্ষতিপূরণের কোনো অর্থ পাননি তারা।
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প
রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ২১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি ফরিদপুরের ভাঙা থেকে শুরু হয়ে বরিশালের গৌরনদী, উজিরপুর, বরিশাল বিমানবন্দর, কাশিপুর, সাগরদী ও টিয়াখালী এলাকা অতিক্রম করবে। পরে কীর্তনখোলা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করে দপদপিয়া, বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালী হয়ে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় গিয়ে শেষ হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পাশাপাশি পায়রা বন্দরের পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লাল নম্বরের অভিশাপে আটকে গেছে মানুষের জীবন
প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের সম্ভাব্য তালিকায় থাকা বরিশাল মহানগরীর টিয়াখালী ও দক্ষিণ সাগরদী এলাকার হাজারো বাসিন্দা বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
টিয়াখালী এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা সুলতান খান জানান, প্রায় আট বছর আগে রেলওয়ের কর্মকর্তারা তার বাড়ির দেয়ালে লাল রঙ দিয়ে নম্বর লিখে যান। এরপর থেকে তাকে জানানো হয়, বাড়ি মেরামত, নতুন স্থাপনা নির্মাণ কিংবা জমি বিক্রি করা যাবে না।
তিনি বলেন, “শেষ বয়সে সন্তানদের সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে থাকতে চাই। কিন্তু বসতভিটাসহ জমি বিক্রি করতে পারছি না। কেউ কিনতেও চায় না, কারণ সবাই জানে এই জমি রেল প্রকল্পের আওতায় পড়েছে।”
একই এলাকার গৃহিণী রাবেয়া বেগম বলেন, “বর্ষা এলেই ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে। কিন্তু রেলের নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থায়ীভাবে সংস্কার করতে পারছি না। বছরের পর বছর কষ্টে বসবাস করছি।”
দক্ষিণ সাগরদী এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন জানান, মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে পৈতৃক জমির একটি অংশ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জমিতে লাল নম্বর থাকার কারণে কোনো ক্রেতা আগ্রহ দেখায়নি। পরে বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়ে মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেন।
ব্যয় বাড়ছে, বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ৫ হাজার ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে ১৯টি রেলস্টেশন এবং একটি জংশন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সরকারি বরিশাল হাতেম আলী কলেজের অধ্যক্ষ ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন,
“যেকোনো মেগা প্রকল্প দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকলে তার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। মুদ্রাস্ফীতি, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের অনেক বেশি হতে পারে।”
ক্ষোভ প্রকাশ নাগরিক সমাজের
প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন,
“পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বছরের পর বছর মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেওয়া হয়েছে। যদি দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব না হয়, তাহলে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে অথবা জমির ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।”
অর্থায়ন না পেলে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০২২ সালে শুরু হয়ে ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে এখনো অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি শুরু করা যায়নি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন,
“প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি মেগা প্রকল্প। বর্তমানে অর্থ সংকটের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারছে না। উন্নয়ন সহযোগী বা বড় ধরনের অর্থায়ন নিশ্চিত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।”
দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এই রেলপথ। তবে অর্থায়নের সংকট কাটিয়ে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিলে শুধু উন্নয়নের স্বপ্নই নয়, জমি অধিগ্রহণের অনিশ্চয়তায় আটকে থাকা হাজারো পরিবারের দুর্ভোগও আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মতামত লিখুন :