

ফারুক আহমেদ সিরাজগঞ্জ:
ওগো তোরা এমন ভারি বর্ষায় আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে”। কিন্তু কবির এ কথা দুরন্তমনা কিশোররা মানতে নারাজ। বাবা মায়ের অগোচরে বড়শি হাতে বেরিয়ে পড়ে পাশের কোনো খালে, বিলে, জিলে বা নদীতে। বর্ষায় বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ হাত ছাড়া করতে নারাজ সিরাজগঞ্জের শিশু কিশোরসহ যুবারা। একটা সময় এমনি দৃশ্য দেখা যেত গ্রাম বাংলার প্রতিটি অঞ্চলেই। শহর থেকেও অনেকে সখের বসে বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করতে বন্ধু বান্ধব নিয়ে ছুটে আসতেন গ্রামের বিলে নদীতে। এখন সবই শ্মৃতি।
সেই খাল বিল আর পুকুরও নেই। মাছ ধরার ধুমও নেই। আধুনিক নগর সভ্যতার যুগে, মানুষের আবাসণ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে হাউজিং কোম্পানীগুলো বালি দিয়ে ভরাট করে ফেলছে হাওড় বাওড় খাল বিলসহ সকল জলাশয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে জলাশয় ভরাট করা হলে এক সময় তীব্র পানি সঙ্কটে পড়বে দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও পড়বে গোটা দেশ। ধাপে ধাপে মরুভুমিতে পরিনত হবে ঐতিহ্যবাহী গ্রাম বাংলা। তখন হা পিত্তেশ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
‘মাছে ভাতে বাঙালি’। এ প্রবাদ কমবেশি সকলেরই জানা। নদীমাতৃক এদেশে ছড়া, খাল, বিল, নদী, সমূদ্র, দিঘি, পুকুর, ডোবা সবখানে এক সময় মাছ পাওয়া যেত। গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ বাঙালির ঐতিহ্য। বাঙালিরা ঝাঁকি জাল, চাই, ডুক, পলই ইত্যাদি দেশিয় মাছ ধরার উপকরণ ব্যবহার করতো। অধিকাংশ লোক বাজার থেকে মাছ না কিনে খাল-বিল, দিঘি, পুকুর ডোবা ইত্যাদিতে ঝাঁকিজাল ব্যবহার করে মাছ ধরে টাটকা মাছ খেতে পারতো।
বড়শির টোপে জড়িয়ে আছে অনেকের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া। বড়শিতে চলতো ওদের সংসার। বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় নদী-খাল ভরাট হয়ে মিঠা পানির মাছ কমে যাওয়া আর গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীতে কেবল কাজের ধরন পাল্টে গেলেও বড়শিতেই বাঁধা ছিলো সিরাজগঞ্জের শতাধিক পরিবারের কয়েক’শ’ জীবন।
নগরায়ন ও গ্রামগঞ্জে বাড়ি ঘর, দোকানপাট সৃষ্টির আধিক্যের কারণে দেশের বহু পুকুর, দিঘি, খাল, বিল, ডোবা, ঝিল, হাওর ইত্যাদি ভরাট হয়ে গেছে দেশে পুকুর, ডোবা ভরাটের কারণে মাছ ধরার কাজে ব্যাপক হারে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা ও বর্তমানে অনেক খানি কমে গেছে। পাল্টে গেয়েছে হতদরিদ্র জেলে পরিবারের জীবন মান।
জলাশয়ে ছিপ ফেলে বড়শি দিয়ে আঁধার গেঁথে মাছ ধরাটা গ্রাম বাংলার চিরায়ত দৃশ্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে এটি এখন হারিয়ে যাবার পথে। এখন বড়শি দিয়ে মাছ ধরা তেমনি তা আর চোখে পড়ে না হঠাৎ কোন হ্যাচকা টানের শব্দ কিংবা নিরব শিকারী বড়শী হাতে পুকুর-খাল ও বাড়ীর পাশের পতিত জলাশয়ের পাশে চুপচাপ বসে আছে ছিপ কেঁপে ওঠার আশায়, গ্রাম বাংলার মেঠোপথের ধারে এমন চিত্র আগে মিলতো হর-হামেশাই। ডুবা কেঁপে উঠলেই আচমকা বড়শীতে টান দেয়, তখন হয়তো উঠে আসে বাহারী কোন রুপালী রঙের মাছ।
উল্লাপাড়া উপজেলা সলঙ্গা থানার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের আগরপুর গ্রামে বড়শি দিয়ে মাছ শিকারী বিপ্লব (৪৫) জানান, আমি ঢাকা থেকে এসে আমার নিজ পুকুরে সখের বসে বড়শিতে মাছ শিকার করছি। মাছ শিকার করাটা আমার ছোটবেলার নেশা। ভালই তো লাগে। টাটকা মাছ নিজ হাতে ধরে দেশী মাছে খাওয়ার মজা ও আনন্দ টাই আলাদা। তিনি আরো বলেন, নানা ধরনের ছোট বড় মাছের জন্য বিভিন্ন রকমের বড়শী, ছিপ, চুবা, সুতা, হুইলারসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম আদি দ্বারা ছোট ছোট মাছ যেমন- টাকি, পুঁটি, শোল, ঘুইঙ্গা, বাইন, কৈ ইত্যাদি ধরা যায়। বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায় আবার কেউ বড় বড় পুরনো পুকুর -দীঘিতে সৌখিন ভাবে দলবদ্ধ হয়ে টিকেট কেটে বড় মাছ ধরে। কেউ মাছ ধরে পেটের তাগিদে আর কেউ মাছ ধরে সৌখিনতার জন্য তবে সবগুলোরই মাধ্যম কিন্তু বড়শী।
তিনি আরো বলেন, দিন দিনে সবকিছু পাল্টাই যাচ্ছে। খাল বিল, নদীনালা পুকুর ভরাট হচ্ছে । আগের মতো অনেক মাছও আর নাই। তিনি আরো বলেন, যাদের জায়গা-জমি নাই তারা দিন-রাইত পানিতে ভাইস্যা মাছ শিকার করোন অনেক কষ্ট করে।
রায়গঞ্জ উপজেলার আমশড়া গ্রামের হাছান আলী জানন, অনেক কাঁকড়া শিকারিও এ সময় বড়শিতে মাছ শিকার করতে আসতেন। আবহাওয়ার পরিবর্তন, রেনুপোনা নিধন, মা মাছ শিকার, নদী ভরাট, বিভিন্ন জায়গায় যতযত্র পুকুর খনন, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, এবং খাল পূনঃখনন না করাসহ বিভিন্ন কারণে নদীতে মাছ এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠেছে। শিকারির বড়শিতেও আর আগের মতো মিলছে না মাছ। অনেক জেলে পরিবারের ছেলেমেয়ে নিয়ে কাটাছে দুর্বিষহ জীবন।’
রায়গঞ্জ উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পানির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির কারণে পেশা ছাড়ছেন বড়শিতে মাছ শিকারিসহ অনেক জেলে।
আমাদের মাছে ভাতে বাঙালির ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য ধরে রাখার স্বার্থে দেশের জলাশায়, পুকুর, দীঘি, খাল ইত্যাদি ভরাট বন্ধ করা জরুরি। সাধারণ মানুষের মাছ ধরার ঐতিহ্যগত রীতি দেশে অব্যাহত রাখতে নগরায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে মাছের বসবাসের পরিবেশের প্রতি যতœশীল হওয়া সরকারসহ সকল নাগরিকের কর্তব্য।
আপনার মতামত লিখুন :