

মিসেস চামেলী আক্তার প্রিয়া
বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় প্রতিদিন বিকেলে একটি চেয়ারে বসে থাকতেন অবহেলিত জীবন যোদ্ধাদে পরাজিত সৈনিক ইসলামী স্কলার আলহাজ্ব মাওঃ জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল । তাঁর হাতে থাকত একটি পুরোনো ডায়েরি, যার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে ছিল এক জীবনের না-বলা গল্প। আশ্রমের সবাই ভাবত, তিনি হয়তো কারও অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু তিনি জানতেন, যার জন্য অপেক্ষা, সে আর কোনোদিন ফিরবে না।
অনেক বছর আগে জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল এ-র বাবা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্যাবসয়ী । সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না। এক কাপ চা ভাগ করে খাওয়া, সন্ধ্যায় ছাদে হাঁটা, আর একে অপরের চোখে ভবিষ্যৎ খোঁজা—এই ছিল তাদের সুখ।
একদিন হঠাৎ ২০০৯/০৫/০১ মে মাসে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হলো।
সেদিনের পর থেকেই পৃথিবী যেন থেমে গেল। মানুষ বলত, “সময় সব ঠিক করে দেয়।” কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, সময় ক্ষত শুকিয়ে দেয়, শূন্যতা নয়।
ছেলে বড় হয়ে বিদেশে চলে গেল। প্রথমে নিয়মিত ফোন করত, পরে সেই ফোনও কমে গেল। শেষ পর্যন্ত ইসলামী স্কলার আলহাজ্ব মাওঃ জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল এ-র ঠিকানা হলো বৃদ্ধাশ্রম।
তবু প্রতিদিন তিনি ডায়েরিতে লিখতেন—
“আজও তোমার জন্য এক কাপ চা রেখে দিলাম। ঠান্ডা হয়ে গেছে, তবু সরিয়ে দিতে মন চায় না।”
একদিন আশ্রমের এক ছোট্ট স্বেচ্ছাসেবী মেয়ে, জুসনা, ডায়েরিটা পড়ে ফেলল। তার চোখ ভিজে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল,
—”দাদা ভাই , যিনি আর নেই, তাঁকে এত ভালোবাসেন কেন?”
দেওয়ান মনিজা বেগম হেসে বললেন,
—”ভালোবাসা মানুষকে ছেড়ে চলে যায় না, মানুষই চলে যায়।”
কয়েকদিন পর এক শীতের সকালে বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান মহিউদ্দিন রশিদ এ-র সুযোগ্য পুত্র জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল আর জেগে উঠলেন না। তাঁর বালিশের পাশে খোলা ছিল সেই ডায়েরি। শেষ পাতায় কাঁপা হাতে লেখা ছিল—
“আজ আর অপেক্ষা নয়। আজ আমি তোমার কাছেই ফিরছি। যদি ভালোবাসার কোনো ঠিকানা থাকে, তবে সেখানে আবার দেখা হবে।”
আশ্রমের সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। মেঘলা ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে বলল,
“ভালোবাসা কখনও প্রাণহীন হয় না। প্রাণহীন হয়ে যায় শুধু মানুষ।”
সেদিন বারান্দার সেই খালি চেয়ারটি যেন নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে রইল—কিছু ভালোবাসা মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে, মানুষের স্পর্শে নয়, স্মৃতির অনন্ত আলোয়।
আপনার মতামত লিখুন :