অপরাহ্ণ ০৬:৪৩
শনিবার
১৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধের ছায়া: বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে?


sohel প্রকাশের সময় : মার্চ ১০, ২০২৬, ২:২৪ অপরাহ্ন /
ইরান যুদ্ধের ছায়া: বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে?

জন্মভূমি ডেক্স

মধ্যপ্রাচ্যে যখনই ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ে, তখন বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়া প্রায় অবধারিত। কারণ ইরান শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি ইরানকে ঘিরে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হয়, তাহলে তার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে তার প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। সেই ঢেউ বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিকেও স্পর্শ করবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। পেট্রোলিয়াম পণ্য, এলএনজি এবং কয়লার বড় অংশই বিদেশ থেকে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতি, পরিবহন খরচ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথ যদি সাময়িকভাবেও বিঘ্নিত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ সরাসরি ইরান থেকে তেল আমদানি না করলেও, বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কারণে সেই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা এড়ানোর সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আমদানি ব্যয় নিয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বোঝা বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে, এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে।

এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—বাংলাদেশ কি এমন বৈশ্বিক ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত?

বাস্তবতা হলো, আমাদের জ্বালানি নীতি এখনও অনেকাংশে প্রতিক্রিয়াশীল। সংকট দেখা দিলে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিশ্বের অনেক দেশ কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তুলেছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট তৈরি হলে কয়েক মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশেও এই ধরনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো জ্বালানি উৎসের সীমিত বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের তেল আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে ওই অঞ্চলে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করে। ভবিষ্যতের জন্য আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া বা অন্যান্য অঞ্চলের বাজারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি বাড়ানো প্রয়োজন।

তবে শুধু আমদানির উৎস পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় সমাধান হলো তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। পরিবহন খাতে বিদ্যুতায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে তেলের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। একইভাবে শিল্প ও পরিবহন খাতে শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আরও অনেক অগ্রগতি সম্ভব।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় জ্বালানি শুধু অর্থনৈতিক পণ্য নয়; এটি কৌশলগত সম্পদ। যে দেশ তার জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখতে পারে, সে দেশই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে। তাই ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রশ্নটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়—এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

সংকটের অপেক্ষা না করে যদি এখন থেকেই জ্বালানি নীতিতে দূরদর্শী সংস্কার আনা যায়, তবে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ঝুঁকি অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব। অন্যথায়, মধ্যপ্রাচ্যের একটি যুদ্ধের ঢেউও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে অপ্রস্তুত অবস্থায় নড়ে দিতে পারে।

Bangla Photocard Generatorv3.7