

লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধিঃ
নাটোরের লালপুরের ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ ও স্মরণীয় নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড(নবেসুমি) গণহত্যা ও শহীদ সাগর দিবস পালিত হচ্ছে আজ। মঙ্গলবার (৫ই মে ২০২৫)নবেসুমি কর্তৃপক্ষ ৫ মে ১৯৭১এর গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে মিলের শহীদ সাগর চত্বরে দিনটি উপলক্ষে শহীদ বেদীতে পুষ্প স্তবক অর্পণ, শহীদ পরিবারের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা ও দোয়ার আয়োজন করেছে। আলোচনা সভা অনুষ্ঠানে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন ভূইয়া টুটুলের সভাপতিত্ব করবেন। মিল কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে ইতিমধ্যে শহীদ পরিবারের সদস্যদের অনেকে দিনটি পালন উপলক্ষে উপস্থিত হয়েছেন। প্রধান অতিথি হিসেবে মাননীয় সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এছাড়া আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখবেন লালপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার( ভূমি), সিবিএ নেতৃবৃন্দ,স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ। অনুষ্ঠান শেষে কাঙ্গালি ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। ১৯৭১সালের ৫ এই গণহত্যায় জড়িত ছিলেন ঈশ্বরদী থেকে আসা মেজর উইলিয়াম এর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি হানাদার। বর্বর পাক বাহিনী মিলের সব গুলো গেটে তালা লাগিয়ে শতাধিক বাঙ্গালীদের সনাক্ত করে মিলের ১ নং গেট সংলগ্ন পুকুর ঘাটে নিয়ে যায়। সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা কর্মচারীকে নিমর্মভাবে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে লাশগুলো পুকুরে ফেলে দেয়। স্বাধীনতার পর শহীদদের সলিল সমাধির নিরব স্বাক্ষী গণহত্যা স্থলের পুকুরটির নামকরণ করা হয় “শহীদ সাগর”। একাত্তরে সিঁড়ির যেসব জায়গায় বুলেট বিদ্ধ মানুষ লুটিয়ে পড়েছিল, সে সব জায়গার লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সিঁড়িতে পা রাখলে এখনো শিউরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ভয়ে গা ছমছম করে। অনেক বছর পরেও এই পুকুরের পানি রক্তের মতোই ছিল “লাল “।
স্থানীয় জনতা গোপালপুর রেল স্টেশনের নাম দিয়েছিল শহীদ আনছার নগর। জনমতকে উপেক্ষা করে ১৯ ৭৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি গোপালপুর রেল স্টেশনের নামকরণ হয় “আজিমনগর স্টেশন “।১৯ ৭৩ সালের ৫মে শহীদ লে. এমএ আজিমের স্ত্রী শামসুন্নাহার আজিম উদ্বোধন করেন” শহীদ সাগর স্মৃতিসৌধ “।পাশেই ২০০০ সালের ৫মে উদ্বোধন করা হয় “।শহীদ স্মৃতি জাদুঘর” শহীদদের ব্যবহৃত পোশাকসহ অন্য জিনিসপত্র এখানে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ উন্মোচন করেছে শহীদ আজিমের ছবিসহ স্মারক ডাকটিকিট। বাংলাদেশের চিনিকল সমূহের শহীদ দিবস হিসেবে ২০০০ সাল থেকে দিনটি পালিত হয়।
এই গণহত্যায় ৪২ জন শহীদের নাম স্মৃতিস্তম্ভ ফলকে উৎকীর্ণ করা আছে। উল্লেখ্য, ৫মে এই গণহত্যায় জড়িত মেজর উইলিয়াম বাহিনীর গুলিতে লালপুর -গোপালপুর সড়কের শিমুলতলা নামক স্থানে হত্যাযজ্ঞের শিকার হন ৭জন। তাদের মধ্যে ৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন হাবিবুর রহমান পিতা :হায়াত মালিথা গ্রাম রামকৃষ্ণপুর, আনোয়ার হোসেন মনি পিতা :আব্দুর রাজ্জাক, মাতা: দেলোয়ারা বেগম, গ্রাম: খলিশা কুড়ি, থানা ও জেলা:নওগাঁ ও তার সহোদর আতোয়ার রহমান মিন্টু এবং আনছারর আলী (লালপুর ছয় রাস্তার মোড়ের গেদীমনের স্বামী ও খোকা মন্ডলের ছেলে)। একই দিনে তৎকালীন মিলের বাঁধের ধারে (বর্তমানে তিন রাস্তার সংযোগ) পাকিস্তানি মেজর উইলিয়ামের দল গোপালপুর বাজার অভিমুখে যাওয়ার পথে ইয়াসিন প্রামাণিক বাগড়ীকে (নিমতলা, তিলকপুর কাজীপাড়া) গুলি করে হত্যা করে লাশ খালে ফেলে দেয়। এরপর তাদের গুলিতে গোপালপুর বাজারে আরও ৭জন শহীদ হন। তারা হলেন, ডাক্তার শাহাদত হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, সাজদার রহমান, আবুল হোসেন, আশরাফ আলী, খোদাবক খলিফা ও কাজি রফিকুল ইসলাম চাঁদ। তাদের স্মৃতিকে অম্লান করতে ২০১৯ সালে ৫ই মে গোপালপুর বাজার কড়ই তলায় নির্মিত হয় স্মৃতি স্তম্ভ।
..
আপনার মতামত লিখুন :