

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টার নাম, পদবি ও স্বাক্ষর জাল করে মিয়ানমার থেকে কয়েক লাখ গরু আমদানির অনুমতি পাইয়ে দেওয়ার নামে ২০ কোটি টাকার প্রতারণা পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি উচ্চপর্যায়ের নাম ব্যবহার করে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ভুয়া সরকারি নথি তৈরি করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই চক্রটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্র বা ‘মঞ্জুরিপত্র’ জাল করে ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস অর্জন করে গরু আমদানির নামে বিপুল অর্থ আদায়ের ফাঁদ পেতেছিল।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার তদন্ত শেষে সিপিসি গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিএমএম আদালতে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতারণার পুরো পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাল দলিল আদান-প্রদানসহ নানা কৌশল এতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সচিবালয়সহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের সিল, স্মারক নম্বর ও স্বাক্ষর জালিয়াতি প্রতিরোধে আরও কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি ওঠে।
এই প্রতারণার সূত্রপাত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে। মামলার বাদী ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাহফুজুর রহমান পল্লবী থানায় ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল এ সংক্রান্ত একটি এফআইআর দায়ের করেন। ওই মামলার সূত্র ধরেই বিষয়টি তদন্তে নামে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন রবিন তার প্রতিষ্ঠান আলিফ এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গরু আমদানির উদ্যোগ নেন। তিনি বিশেষ করে ‘শাহপরীর দ্বীপ করিডোর’ ব্যবহার করে গরু আমদানির জন্য সরকারি অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এই সুযোগটিই কাজে লাগায় প্রতারক চক্রটি। বিষয়টি এভাবেই তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্তে উঠে আসে, ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন রবিনের প্রথমে পরিচয় হয় ইউনিয়ন ব্যাংকের কর্মকর্তা খোরশেদ আলমের সঙ্গে। খোরশেদ আলম তাকে জানান, সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদবির ছাড়া এত বড় পরিসরে গরু আমদানির অনুমতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
এরপর খোরশেদ আলম রবিনকে জাফর ইকবাল ওরফে রাঙ্গা নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। জাফর ইকবাল নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন এবং দাবি করেন যে সচিবালয়ের উচ্চপর্যায়ে তার শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে।
জাফর ইকবাল ও তার সহযোগীরা ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন রবিনকে প্রস্তাব দেন যে তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দুই লাখ গরু আমদানির একটি বিশেষ ‘মঞ্জুরিপত্র’ বা ‘Allocation Letter’ এনে দিতে পারবেন।
তবে এর বিনিময়ে তারা প্রতি গরু বাবদ দুই হাজার টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকা দাবি করেন। শুরুতেই অগ্রিম হিসেবে ১০ কোটি টাকা দেওয়ার শর্তও দেওয়া হয়। পরে দীর্ঘ দরকষাকষির পর ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে এই জালিয়াতি চুক্তি চূড়ান্ত হয়।
আপনার মতামত লিখুন :