অপরাহ্ণ ০২:২৪
মঙ্গলবার
৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০ জুলাই ২০২৪,বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কারফিউ, সেনা মোতায়েন ও ইতিহাসের এক অবরুদ্ধ অধ্যায়


sohel প্রকাশের সময় : জুলাই ২০, ২০২৬, ৯:৩২ পূর্বাহ্ন /
২০ জুলাই ২০২৪,বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কারফিউ, সেনা মোতায়েন ও ইতিহাসের এক অবরুদ্ধ অধ্যায়

এম,এ,মান্নান,স্টাফ রিপোর্টার,নিয়ামতপুর (নওগাঁ)
২০২৪ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব, স্তব্ধ ও কলঙ্কময় দিন হিসেবে যুক্ত হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আগের কয়েকদিনের টানা সহিংসতা, ভাঙচুর ও নজিরবিহীন প্রাণহানির পর এই দিনটিতে দেশজুড়ে জারি করা হয়েছিল কঠোর সান্ধ্যআইন (কারফিউ) এবং বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা হয়েছিল সশস্ত্র সেনাবাহিনী।​জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে আন্দোলন দমনে পুলিশ, তৎকালীন শাসক দলের অঙ্গসংগঠন এবং অন্যান্য বাহিনীর বলপ্রয়োগের ফলে পরিস্থিতি ক্রমে সহিংস রূপ নেয়। বিশেষ করে ১৮ ও ১৯ জুলাই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপক সংঘর্ষ, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ১৯ জুলাই মধ্যরাত (রাত ১২টা) থেকে সরকার সারা দেশে কারফিউ জারি করে এবং সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেয়।​২০ জুলাই সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরের রাজপথগুলো সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়ে। প্রধান প্রধান মোড়ে সাঁজোয়া যান (এপিসি) নিয়ে অবস্থান নেন সেনা সদস্যরা। সাধারণ মানুষের বের হওয়ার ওপর ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা।​‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কারফিউ চলাকালীন আইন অমান্যকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।​১৮ জুলাই রাত থেকেই সারা দেশে কমপ্লিট ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট (ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ) কার্যকর ছিল। ২০ জুলাইও দেশ পুরোপুরি তথ্য ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বড় ডিজিটাল অবরুদ্ধতা, যার ফলে কোথায় কী ঘটছে বা কতজন হতাহত হচ্ছেন, তার সঠিক তথ্য পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।জুলাই কারফিউর মধ্যেই আগের দিনের সংঘর্ষে আহত শত শত মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পরবর্তীতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় নিহতদের স্বজনদের আহাজারি আর আহতদের আর্তনাদে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।​স্বাধীন বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এভাবে নির্বিচারে বলপ্রয়োগ, শত শত মানুষের বুলেটের আঘাতে মৃত্যু এবং পুরো দেশকে ইন্টারনেটবিহীন করে সামরিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনাকে বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজ এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে গণ্য করে।​একটি অরাজনৈতিক ও সাধারণ ছাত্র আন্দোলনকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে বুলেটের ভাষায় দমনের চেষ্টা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক চরম ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়।কারফিউর সুযোগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের বাসাবাড়িতে গভীর রাতে ব্লক রেইড (চিরুনি অভিযান) ও গণগ্রেপ্তার শুরু হয় এই সময় থেকে, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে।​২০ জুলাই ২০২৪-এর সেই কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের গর্জন সাময়িকভাবে রাজপথকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে দমন করতে পারেনি। এই রক্তক্ষয়ী ও অবরুদ্ধ দিনটিই পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী ক্ষত এবং গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে লেখা থাকবে।