অপরাহ্ণ ০৫:১১
বুধবার
৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ খুনের মতো গুরুতর অপরাধ বেড়েছে


sohel প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২২, ২০২৬, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন /
বাংলাদেশ খুনের মতো গুরুতর অপরাধ বেড়েছে

আমাদের জন্মভুমি নিউজ ডেক্স

পারিবারিক কলহ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, জমি সংক্রান্ত বিরোধে খুনের ঘটনা ঘটছে। কোথাও স্বজনের হাতে হত্যার শিকার হচ্ছে আপনজন। গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বেও ঘটছে প্রাণহানি।

দেশের পাঁচ জেলায় ২৪ ঘণ্টায় ১০ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। কক্সবাজারের টেকনাফে গহিন পাহাড় থেকে গতকাল মঙ্গলবার তিন ব্যক্তির রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় এক দম্পতি ও তাদের দুই ছেলেমেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। ফেনীর দাগনভূঞায় ছোট ভাইয়ের রডের আঘাতে বড় ভাই খুন হয়েছেন। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পারিবারিক কলহের জেরে ছোট ভাইয়ের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে বড় ভাই নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারাদেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে ৩১৭টি। গড়ে প্রতি মাসে খুনের ঘটনা ২৮৪টি। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা ছিল ৭৫০টি। জানুয়ারিতে ২৯৪, ফেব্রুয়ারিতে ২১৭ ও মার্চে ২৩৯ জন খুন হয়েছিলেন। গত বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ২৫০টি। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ৭১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২৩১টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৪০ ও মার্চে ২৩৯টি। ওই বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ২৩৬টি।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে খুনের যত মামলা হয়েছে, তার মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যা ও আগের বিভিন্ন সময়ের খুনের মামলা অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চে মোট হত্যা মামলা হয়েছে ৩১৬টি। এর মধ্যে ৭৭টি আগের মামলা। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে দায়ের ৩০০ মামলার মধ্যে ৮৩টি আগের ঘটনার।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণত খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনার পরিসংখ্যান সমাজে অপরাধপ্রবণতা কম নাকি বেশি, তা নির্দেশ করে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারাদেশে বিভিন্ন থানা ও পুলিশের স্থাপনা থেকে পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ছয় লাখ ৫২ হাজার আট রাউন্ড গুলি লুট হয়েছে। এখন পর্যন্ত এক হাজার ৩২৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। গুলি উদ্ধার হয়নি দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪ রাউন্ড। পুলিশের লুণ্ঠিত সব অস্ত্র-গুলি উদ্ধার না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঝুঁকি দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য দ্রুত এসব উদ্ধার প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। অন্তর্বর্তী সরকার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী একাধিক দফায় যৌথ অভিযান চালিয়েছে। এ ছাড়া কারাগার থেকে লুট হওয়া বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি এখনও বেহাত।

গত তিন মাসের অন্তত ১৫টি আলোচিত হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পারিবারিক, আর্থিক, ব্যক্তিগত বিষয়ে বিরোধ এবং মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আধিপত্য নিয়ে বিরোধে খুনের ঘটনা ঘটেছে। দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় বড় ধরনের অভিযানও চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মোহাম্মদপুরে কয়েক দফা চালানো হয় অভিযান। এর পরও মোহাম্মদপুরে মাঝেমধ্যে হত্যার ঘটনা ঘটছে।

এদিকে চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রস্তুত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের সদরদপ্তরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে সারাদেশে খুনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছরের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা ৪০টি বেশি ছিল। আবার গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের তিন মাসে ঘটনা বেশি ১০৪টি।

বিভিন্ন ঘটনায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পুলিশও হামলার শিকার হচ্ছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা মার্চে ৬৩, ফেব্রুয়ারিতে ৪২ ও জানুয়ারিতে ৪২টি। প্রথম তিন মাসে মোট ঘটনা ১৪৭। ২০২৫ সালের একই সময়ে ১৭১ জন এবং ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ১২৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ‘মবের’ শিকার হন পুলিশ সদস্যরা।

প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, ডাকাতি, দস্যুতা ও চুরির ঘটনা ঘটছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাবে চলতি বছরের তিন মাসে ডাকাতি হয়েছে ১৩৩টি, ছিনতাই ৪৩৯টি ও চুরির ঘটনা ২ হাজার ৩১৮টি। ২০২৫ সালের একই সময়ে ডাকাতির ঘটনা ছিল ২০৫টি, ছিনতাই ৪৯৫টি ও চুরির ঘটনা ২ হাজার ৩৩৬টি। এর আগের বছরের প্রথম তিন মাসে ডাকাতির ঘটনা ছিল ৮৭টি, ছিনতাই ৩৭৩ ও চুরির ঘটনা ২ হাজার ৪৩৪টি। চলতি বছরের তিন মাসের তুলনায় গত বছরের একই সময়ে ৭২টি ডাকাতি ও ৫৬টি ছিনতাই বেশি ঘটেছে। এ ছাড়া চলতি বছরের তিন মাসের তুলনায় গত দুই বছরের একই সময়ে চুরির ঘটনা বেশি ছিল। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় অনেকে থানায় অভিযোগ দিতে যান না। তাই সবসময় পরিসংখ্যান দিয়ে এ ধরনের অপরাধের সঠিক বিশ্লেষণ করা যায় না।

২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে অপহরণের ঘটনা ছিল ১৪৫টি। ২০২৫ সালে একই সময়ে ছিল ২৬৬টি। এ বছর তিন মাসে ২৫৩ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। গত তিন মাসের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে অপহরণের ঘটনা ১৩টি বেশি ছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৯৪৭টি। এর আগের বছরের একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৪ হাজার ৯২৪টি এবং ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ৩ হাজার ৯২৩টি। এ বছরের চেয়ে গত বছরের একই সময়ে ৯৭৭টি ধর্ষণের ঘটনা বেশি ছিল।

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে সোমবার গভীর রাতে চারজনকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহতরা হলেন– হাবিবুর রহমান, তাঁর স্ত্রী পপি সুলতানা, তাদের ৯ বছরের ছেলে পারভেজ রহমান ও ৩ বছরের মেয়ে সাদিয়া খাতুন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ডাকাতি অথবা পূর্বশত্রুতার কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।

ঘটনা-১
গত ১৭ এপ্রিল পল্লবীতে একটি বাসায় ফিরোজা খানম জোসনা (৬৮) নামে এক শিক্ষিকাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ডি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ভাড়া বাসায় ফিরোজা একাই বাস করতেন। প্রায় ৩০ বছর আগে ফিরোজার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। এরপর তিনি আর বিয়ে করেননি। সেই থেকে আলাদা বাস করতেন। তিনি পল্লবীতে হলি ক্রিসেন্ট আইডিয়াল স্কুল নামে একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষিকা ছিলেন। শিক্ষকতা করে নিজের খরচ চালাতেন। ফিরোজার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম।

ঘটনা-২
যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় পাওনা টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে মাহাদিয়া হাসান নবনী ওরফে দিয়ামনি (২০) নামে এক কলেজছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় তাঁর মা নুসরাত জাহান মৌসুমী, বোন জয়া ও ভাই মুয়াজ আহমেদকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করা হয়। মৌসুমীর একটি হাত কবজি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিহত দিয়া বোরহান উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১৪ এপ্রিল রাতে এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনা-৩
চার দিনের ব্যবধানে মোহাম্মদপুরে দুই যুবক খুন হয়। আসাদুল হক (২৮) নামে এক যুবককে ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত আসাদুল হক মোহাম্মদপুরের মেট্রো হাউজিংয়ের বি-ব্লকের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে বন্ধুরা তাঁকে খুন করে। আসাদুলের নামে মাদক, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় ছয়টি মামলা রয়েছে। লাশ উদ্ধারের সময় আসাদুলের পকেট থেকে একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১২ এপ্রিল রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী রোডের বেড়িবাঁধ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সংঘর্ষে অ্যালেক্স গ্রুপের নেতা মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত ইমনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সাতটি মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অ্যালেক্স ইমন ও আরমান শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। এর জের ধরে তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঘটনা-৪
প্রেম-সংক্রান্ত বিষয়ে গত ১৫ মার্চ সন্ধ্যার পর রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিবুল ইসলাম অবস্থান করছিলেন। রাত সোয়া ৯টার দিকে তাঁকে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় উপস্থিত লোকজন ধাওয়া দিলে হত্যায় অংশ নেওয়া কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও সিহাব নামে একজন ধরা পড়ে। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। প্রেম-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে রাকিবুলকে হত্যা করা হয়।

ঘটনা-৫
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর মতিঝিলে মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ নামে এক যুবককে খুনের পর সাত টুকরো করে কালো পলিথিনে ভরে বিভিন্ন জায়গায় ফেলে আসে তার রুমমেট শাহীন আলম। ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ নয়াপল্টন, গুলিস্তান, কমলাপুর ও আমিনবাজারের সালেহপুর সেতুর নিচ থেকে যুবকের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর হোটেল কর্মচারী শাহীনকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যার কথা স্বীকার করে সে। মতিঝিলে কবি জসীম উদ্‌দীন রোডের একটি বাসায় দুজন ভাড়া থাকতেন। ওবায়দুল্লাহ একটি হোমিও ক্লিনিকে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর এলাকায়। শাহীনের বাড়ি হবিগঞ্জ।