রাজশাহীর ঐতিহ্য ও গৌরবের ৩৬ বছর: মডার্ন বক্সিং ক্লাবের অনুসন্ধানী পথচলা

খেলার খবর
Spread the love


ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীতে কেক কেটে ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করল রাজশাহীর ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম মডার্ন বক্সিং ক্লাব (MBC)। শনিবার (২২ নভেম্বর) বিকাল ৫টায় রাজশাহী জিমনেসিয়ামে এ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত হয়।

১৯৮৯ সালের ২২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি শুধুমাত্র একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের বক্সিং ইতিহাসের অন্যতম প্রধান আঁতুড়ঘর। রাজশাহী জিমনেসিয়ামের প্রাণকেন্দ্রে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার তরুণকে শারীরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলার পাঠ এবং পেশাদার জীবনের পথ দেখিয়েছে।

ইতিহাসের পটভূমি ও প্রতিষ্ঠাতা:
মডার্ন বক্সিং ক্লাবের জন্ম হয় প্রখ্যাত ক্রীড়াবিদ এবং বিকেএসপি’র বক্সিং প্রশিক্ষক মোঃ আবু সুফিয়ান চিশতী বাবু-এর হাত ধরে। তার দূরদর্শী উদ্যোগে রাজশাহী শুধু একটি বিভাগীয় শহর হিসেবে নয়, দেশের বক্সিং মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। ক্লাবটি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল তৃণমূল পর্যায়ে বক্সিংয়ের প্রসার ঘটানো এবং তরুণ সমাজকে সুস্থ, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলা।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্লাবের প্রধান প্রশিক্ষক মোঃ শফিউল আজম মাসুদ, যিনি বর্তমানে এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাকে সহায়তা করছেন সহকারী জুনিয়র প্রশিক্ষক মোঃ জুয়েল আহম্মেদ জনি, মোঃ টিপু সুলতান, মো: হাফিজ ও মোঃ আরিফ হোসেন।
এসময় বিশেষ অতিথী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, ন্যাশনাল জাজ ও রেফারি মোঃ রকিবুল হোক তুহিন।
এছাড়াও প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে বর্তমান, সাবেক সিনিয়র বক্সারসহ প্রায় ১২০ জন এই উদযাপনে অংশ নেন, যা ক্লাবের সক্রিয়তা প্রমাণ করে।

এসময় প্রধান প্রশিক্ষক শফিউল আজম মাসুদ বলেন, মডার্ন বক্সিং ক্লাব শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, সমাজের প্রতিও দায়বদ্ধতা পালন করে চলেছে।
বর্তমানে ক্লাবটি তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখা এবং পেশাদার ক্রীড়া জীবনের পথে এগিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
বক্সিংয়ের মতো একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ খেলা, যা নিয়মিত কঠোর অনুশীলন দাবি করে, তা তরুণদেরকে বিপথগামী হওয়া থেকে বিরত রাখতে এবং তাদের মধ্যে সময়ানুবর্তিতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে সাহায্য করে।

মডার্ন বক্সিং ক্লাব (MBC) থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া খেলোয়াড়দের সাফল্যের পরিসংখ্যান সত্যিই ঈর্ষণীয় এবং বহুবিধ। ক্লাবটির একটি অন্যতম প্রধান অর্জন হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদক জয়।
বহু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বক্সার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও পদক অর্জন করে ক্লাবের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এই সাফল্য শুধু ক্রীড়া ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; ক্লাবটি বেকারত্ব দূরীকরণ এবং পেশাদার জীবনের নিশ্চয়তা দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বক্সার খেলোয়াড় কোটায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং পুলিশের মতো সরকারি সংস্থাগুলোতে চাকরি পেয়েছেন, যা ক্রীড়ার মাধ্যমে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এছাড়া, বৃহত্তর বক্সিংয়ের প্রভাব বিবেচনা করলে দেখা যায়, রাজশাহী অঞ্চল থেকে উঠে আসা অনেক কিংবদন্তি বক্সার, যেমন প্রয়াত মোশাররফ হোসেন (যিনি ১৯৮৬ সালের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম পদক জেতেন), তাদের প্রাথমিক প্রেরণা ও ভিত্তি এই অঞ্চলের শক্তিশালী বক্সিং ঐতিহ্য থেকেই পেয়েছেন। যদিও মোশাররফ হোসেন সরাসরি মডার্ন বক্সিং ক্লাবের নন, ক্লাবটি রাজশাহী অঞ্চলের এই বক্সিং ঐতিহ্যকে লালন ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় এক অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।

মডার্ন বক্সিং ক্লাব (এমবিসি), রাজশাহীর, ৩৬ বছরের পথচলায় এক জীবন্ত কিংবদন্তী। এটি কেবল বক্সিংয়ের ঐতিহ্যকে ধারণ করেনি, বরং হাজার হাজার তরুণকে শৃঙ্খলাপরায়ণ, সুস্থ এবং সফল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে। ক্লাবটির অব্যাহত সাফল্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিঃসন্দেহে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *