পবিত্র ঈদুল ফিতরের আসমানি তাকিদ

দেশের খবর
Spread the love
Print Friendly, PDF & Email
image_pdfimage_print

সম্পাদকীয়
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আসমানি তাকিদ
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাকিদ’। ১৯৩১ সালে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ইহাই প্রথম ইসলামি গান। এই গানের মাধ্যমে আমরা ঈদের আনন্দকে সম্যক উপলব্ধি করিতে পারি। দেশের আনাচকানাচে যখন এই গানটি একসঙ্গে বাজিয়া উঠে, তখন আমরা বুঝিতে পারি পশ্চিমাকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ উঠিয়াছে। তখন মুসলিম সমাজে ঈদ আনন্দের ফল্গুধারা বহিয়া যায়।

আজ ২৯ রমজান সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে শাওয়াল মাসের সেই কাঙ্ক্ষিত হেলাল বা নতুন চাঁদ দেখা দিলে আগামীকাল সোমবার পালিত হইবে পবিত্র ঈদুল ফিতর। আর যদি চাঁদ না দেখা যায়, তাহা হইলে পরবর্তী দিন মঙ্গলবার সারা দেশে একযোগে পালিত হইবে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান এই ধর্মীয় উৎসব। মূলত সারা বিশ্বের প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব উৎসব রহিয়াছে। তবে মুসলিম জাতির ধর্মীয় আনন্দোৎসব পৃথিবীর অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর ধর্মীয় উৎসবের চাইতে একেবারেই আলাদা ও ভিন্নতর। ইসলাম প্রবর্তিত আনন্দোৎসবে এমন সব অনুষ্ঠানাদি ও আবশ্যক দায়িত্ব-কর্তব্য রহিয়াছে, যাহা ইহকাল ও পরকালের জন্য কল্যাণকর।

আমরা জানি, আরবি ‘ঈদ’ অর্থ খুশি, আনন্দ; আর ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ স্বভাব বা ভঙ্গকরণ। দীর্ঘ এক মাস মহান আল্লাহ-তায়ালার নির্দেশ পালনার্থে সংযম সাধনার পর বিশ্বজাহানের মুসলমানগণ এই দিন উপবাস ব্রত হইতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া আসেন এবং এই উপলক্ষ্যে আনন্দোৎসব করিয়া থাকেন: এই জন্য এই উৎসবের নামকরণ করা হইয়াছে ‘ঈদুল ফিতর’ বা স্বাভাবিকতায় প্রত্যাবর্তন বা রোজা ভঙ্গের উৎসব। পৃথিবীর অনাদিকাল হইতে মানবজাতির দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য রোজা বা উপবাসব্রত পালনের রীতিনীতি চলিয়া আসিতেছে। বিশেষ করিয়া, মাহে রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনের পর রোজাদারগণ যেমন সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো নিষ্পাপ হইয়া যান, তেমনি তাহারা ঈদুল ফিতরের দিন আল্লাহর রেজামন্দি বা বিশেষ সন্তুষ্টি লাভ করিলে তাহাদের মনে আধ্যাত্মিক আনন্দ আর ধরিয়া রাখা যায় না। তাহারই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তাহারা ঈদের দিন দুই রাকাআত ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন। এই আনন্দের আতিশয্যে আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে গরিব-দুঃখীর মধ্যে দানখয়রাতসহ নানাভাবে পরোপকার ও পরস্বার্থে নিজেকে বিলীন করিয়া দেন।

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, হজরত রসুলে করিম (স.) মক্কা হইতে মদিনায় হিজরত করিবার পর দ্বিতীয় হিজরি সনে ঈদের প্রচলন ঘটে। ইহার আগে প্রতি বৎসর মদিনায় পারসিকদের প্রভাবে শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ উৎসব’ এবং বসন্তের পূর্ণিমায় ‘মিহিরজান উৎসব’ উদ্যাপিত হইত। এ দুইটি উৎসবের বদলে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ন্যায় দুইটি মহৎ ও মহা কল্যাণকামী উৎসব পালনের রীতি প্রবর্তন করা হয়। তবে মুসলমানদের ঈদ সামাজিক উৎসবের পাশাপাশি একটি ধর্মীয় ইবাদতও বটে। এই জন্য ঈদের দিন ও ঈদের রাতের অপরিসীম ফজিলতের কথা মাথায় রাখিয়া আমাদের তদনুযায়ী আমল করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া সতর্ক থাকিতে হইবে, যাহাতে আমরা এই দিন অনৈসলামিক কোনো কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত না হই।

প্রকৃতপক্ষে ঈদুল ফিতর আসে আনন্দের বার্তা লইয়া, আসে সীমাহীন প্রেমপ্রীতি, সৌহার্দ-ভালোবাসা ও কল্যাণের সওগাত লইয়া। তাই এই পবিত্র দিন আমাদের মধ্যে থাকা হানাহানি ও বিভেদ-বিসম্বাদ ভুলিয়া যাইতে হইবে। ঈদগাহে যাওয়ার আগেই যথাসম্ভব সর্বপ্রকার মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাঁটি ও ভুল বোঝাবুঝি দূর করিতে হইবে। এই জন্য বিদ্রোহী কবি তাহার ঈদের সেই বিখ্যাত গানের আরেক জায়গায় লিখিয়াছেন: ‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,/ তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ’। এই বিশ্বকে আনন্দ ও শান্তিময় করিতে হইলে আমাদের প্রেমপ্রীতি ও ভালোবাসা দিয়া সকলের অন্তর জয় করিবার কোনো বিকল্প নাই।

উল্লেখ্য, এই বৎসর আমাদের দেশে মাহে রমজানে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি ছিল সহনীয় ও সন্তোষজনক। তাহা ছাড়া এইবার নাড়ির টানে ঘরে ফিরা মানুষের ঈদ যাত্রাও হইয়াছে স্বস্তিদায়ক। আমরা আশা করি, ঈদ পালন শেষে মানুষের কর্মস্থলে ফেরাও শান্তি, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হইবে। পরিশেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে আমরা সবাইকে জানাই ঈদের অনাবিল প্রীতি ও শুভেচ্ছা-ঈদ মোবারক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *