নিজস্ব প্রতিবেদক
কজন অপরিচিত ব্যক্তি একজন পথচারীকে কোনো একটি ঠিকানা পড়তে দিচ্ছেন। ওই ঠিকানাটি পড়ার সময় ঠিকানা লেখা কাগজে টোকা দিয়ে বা তার নিশ্বাসের সঙ্গে স্কোপোলামিন পাউডার শরীরে ঢুকে নার্ভাস সিস্টেমকে আক্রান্ত করছে এবং তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে ছিনতাইকারীর হাতে। স্কোপোলামিন, যা সাধারণত ব্ল্যাক ম্যাজিক বা শয়তানের নিশ্বাস বা ডেভিলস ব্রেথ নামে পরিচিত, একটি শক্তিশালী ওষুধ যার অপরাধমূলক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের কাছে যা আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। স্কোপোলামিন মূলত চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হলেও, অপরাধীরা একে ব্যবহার করে জনসাধারণ বশীভূত এবং বিভ্রান্ত করে ছিনতাই বা চুরি করে থাকে। ঈদের সামনে এ শয়তানের নিশ্বাস ব্যবহার করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে রাজশাহীতেও।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাইস্কুল মার্কেটের মা কসমেটিক এ্যান্ট গিফট দোকানের মালিক মহিদুর আলমর(মজনু)। রবিবার (১০ মার্চ) দুপুরে তার মা কসমেটিক এ্যান্ট গিফটের দোকানে দুই জন মুখে মাস্ক পড়া ভদ্রলোক ইংরেজীতে কথা বলে একটি শ্যাম্পু কিনতে আসেন। শ্যাম্পু দেখে পছন্দ হয় ও ২৫০ টাকা দাম পরিশোধ করেন তারা। এরপর ভদ্রলোক তাদের কাছ থেকে দুইটা ৫০০ টাকার নোট বের করে দোকানদার মজনুকে টুকা মেরে দেয় এবং বলে এক হাজার টাকার একটা নোট দেন। দোকানদার একটা কড়কড়ে এক হাজার টাকার নোট দিয়ে দেয়। এ সময় ঐ ভদ্রলোক বলে এমন নোট না, তাদের কাছ থেকে অরেকটি পুরাতন নোট বের করে দোকানীর মুখের সামনে ধরে বলে এমন নোট দেন। এরপরে দোকানদার মজনুর ক্যাসবাক্স থাকা ১৩ হাজার টাকা নিয়ে ঐ ভদ্রলোক চম্পট দেয়। কিছু সময়পর দোকানদার তাদের দেখতে পাইনি এবং ক্যাস বক্সে টাকা নাই। প্রতারণাটি সংঘটিত করতে ৫০০ টাকার নোটে ব্যবহার করা হয়েছিল স্কোপোলামিন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে রাজশাহী মহানগরীতেও এমন ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে বলে জানা যায়।
চিকিৎসকরা জানান, স্কোপোলামিন মূলত একটি সিন্থেটিক ড্রাগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ওষুধ তৈরিতে এর ব্যবহার আছে। বমি বমি ভাব, মোশন সিকনেস এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশন পরবর্তী রোগির জন্য ওষুধে এর ব্যবহার রয়েছে। অতীতে এটি মানসিক রোগের চিকিৎসায় এবং সত্য কথা বলার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে, এর অন্ধকার দিকটি হলো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার, বিশেষত চুরি এবং হামলার ক্ষেত্রে। এটি তরল এবং পাউডার দুই রূপেই পাওয়া যায়।
স্কোপোলামিন মানুষের মস্তিষ্ক বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, যা অ্যাসিটাইলকোলিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারকে ব্লক করে। এতে মানুষের স্মৃতিভ্রংশ, বিভ্রান্তি এবং দিশাহীনতা, মুখ শুষ্ক হওয়া এবং দৃষ্টিবিভ্রম, তন্দ্রাচ্ছন্নতা বা অজ্ঞান হয়ে পড়া, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অভাব দেখা দেয়।
অপরাধীরা সাধারণত গুঁড়ো বা তরল আকারে স্কোপোলামিন শিকারের মুখের দিকে ছুঁড়ে দেয় বা পানীয়তে মিশিয়ে দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভুক্তভোগী উচ্চমাত্রায় বশীভূত হয়ে পড়ে, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং প্রতিরোধ করার শক্তি থাকে না। ফলে, তারা সহজেই চুরির শিকার হয় বা প্রতারণার শিকার হতে পারে।
স্কোপোলামিন মূলত পাউডার হিসেবে প্রতারণার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। ভিজিটিং কার্ড, কাগজ, কাপড় কিংবা মোবাইলের স্ক্রিনে এটি লাগিয়ে কৌশলে টার্গেট করা ব্যক্তিদের নিশ্বাসের কাছাকাছি আনা হয়। স্কোপোলামিন মানুষের নাকের চার থেকে ছয় ইঞ্চি কাছাকাছি আসলেই নিশ্বাসের আওতায় আসে। এটি নিশ্বাসের সঙ্গে ঢুকলেই মাত্র ১০ মিনিট বা তারও আগে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। মেমোরি এবং ব্রেন তখন সচেতনভাবে কাজ করতে পারে না। কারও ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হতে এক ঘণ্টা লাগে, আবার কেউ তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেও স্বাভাবিক হতে পারে না।
কেউ যদি এমন পরিস্থিতির শিকার হয় তাহলে, তাৎক্ষণিক বিশ্বস্ত কারও সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে হবে বা জরুরি পরিষেবাগুলো ব্যবহার করে পুলিশকে জানাতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং জাগ্রত থাকার চেষ্টা করতে হবে। একাকী থাকা যাবে না। ব্যক্তিগত সম্পদ নিরাপদে রাখতে হবে।
রাজশাহী মহানগরীর শালবাগান এলাকার সিমেন্ট কোম্পানীতে চাকুরিরত কামরুল ইসলাম জানান, মলম পার্টিসহ অন্যান্য অপরাধ বিষয়ে মানুষ জানলেও শয়তানের নিশ্বাস বিষয়ে এখনোও অনেকেই অজানা। স্কোপোলামিন বা ডেভিলস ব্রেথ এমন একটি বিপজ্জনক পদার্থ যা অপরাধীরা তাদের শিকারের বোধশক্তি নষ্ট করে সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করে। এর প্রভাব এতটাই তীব্র যে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের কার্যকলাপের কথা কিছুই মনে রাখতে পারে না। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সকলে মিলে সচেতন থাকলে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিলে আমরা নিজেদের এবং আশেপাশের মানুষদের নিরাপদ রাখতে পারব
