জন্মভূমি নিউজ ডেস্ক :
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশের কথা বিবেচনা করছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগ বন্ধ করে দেবে। এটি দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণশীলদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। এই পদক্ষেপটি তার নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শিক্ষা বিভাগের কিছু কর্মসূচি বন্ধ করতে চান, আর কিছু অন্য সরকারি সংস্থার অধীনে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দেখা খসড়া আদেশ অনুযায়ী, ‘আইনসম্মত সর্বোচ্চ সীমার ভিত্তিতে’ ট্রাম্প তার সদ্য নিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী লিন্ডা ম্যাকমাহনকে ‘শিক্ষা বিভাগ বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে’ নির্দেশ দেবেন। তবে শিক্ষা বিভাগ পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।
১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিভাগটি সরকারি স্কুলের জন্য তহবিল পরিচালনা করে, শিক্ষার্থীদের ঋণ প্রদান করে এবং নিম্নআয়ের শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে। ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা এই সংস্থাটির বিরুদ্ধে ‘তরুণদের অনুপযুক্ত জাতিগত, যৌন ও রাজনৈতিক উপাদান শেখানোর’ অভিযোগ এনেছেন।
গত ডিসেম্বর ট্রাম্প সাবেক ওয়ার্ল্ড রেসলিং এন্টারটেইনমেন্টের (ডব্লিউডব্লিউই) সিইও ও তার রূপান্তরকালীন কমিটির সহসভাপতি লিন্ডা ম্যাকমাহনকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেন। তবে সিনেট এখনো তার নিয়োগ চূড়ান্ত করার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেনি।
শিক্ষা বিভাগ কী করে
একটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো, শিক্ষা বিভাগ মার্কিন স্কুল পরিচালনা করে ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে এসব দায়িত্ব অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় জেলা কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত।
এই সংস্থাটি মূলত শিক্ষার্থীদের জন্য ঋণ কর্মসূচি তদারকি করে এবং নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘পেল গ্রান্ট’ প্রদান করে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সহায়তা করে।
এ ছাড়া সংস্থাটি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসূচি চালাতে অর্থ প্রদান করে। পাশাপাশি শিক্ষা বিভাগ এমন নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করে, যা সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলে জাতিগত বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রতিরোধে সহায়তা করে।
বাজেট ও কর্মী সংখ্যা
২০২৪ অর্থবছরে শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের ২ শতাংশেরও কম। এই সংস্থাটিতে প্রায় চার হাজার ৪০০ কর্মী রয়েছে, যা মন্ত্রিসভা স্তরের সংস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট।
মার্কিন স্কুলগুলোর জন্য বেশির ভাগ সরকারি তহবিল অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকার সরবরাহ করে। ২০২৪ সালে এডুকেশন ডাটা ইনিশিয়েটিভ অনুমান করেছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মোট ৮৫৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা শিক্ষার্থী প্রতি ১৭ হাজার ২৮০ ডলারের সমতুল্য।
ট্রাম্প কি শিক্ষা বিভাগ বন্ধ করতে পারবেন
এর উত্তর হলো, এককভাবে, না। শিক্ষা বিভাগ বিলুপ্ত করতে শুধু কংগ্রেসের অনুমোদন হলেই হবে না, বরং মার্কিন সিনেটে সুপারমেজরিটি (১০০ জনের মধ্যে ৬০ জন সিনেটরের সমর্থন) প্রয়োজন হতে পারে।
সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের ৫৩-৪৭ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, ফলে তাদের অন্তত সাতজন ডেমোক্র্যাট সিনেটরের সমর্থন প্রয়োজন, যা রাজনৈতিকভাবে দুরূহ। এমনকি হউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসেও ট্রাম্পের পক্ষে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
গত বছর একটি বিলের সংশোধনী হিসেবে শিক্ষা বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল। তবে সেটি ব্যর্থ হয়। কারণ ৬০ জন রিপাবলিকান সব ডেমোক্র্যাটের সঙ্গে যোগ দিয়ে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেন।
এদিকে ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অন্যান্য সরকারি বিভাগ সংকুচিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন, যদিও এসব উদ্যোগের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে পাওয়া ট্রাম্পের খসড়া আদেশে বলা হয়েছে, শিক্ষা বিভাগ পুরোপুরি বিলুপ্ত করার ক্ষমতা শুধু কংগ্রেসের রয়েছে। তবে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্থাটিকে নিজেকে তার কার্যক্রম ধাপে ধাপে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া ফেডারেল কর্মীর সংখ্যা হ্রাস করার জন্য প্রশাসনের প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষা বিভাগের কর্মীরাও রয়েছেন।
কেন রিপাবলিকানরা এটি বিলুপ্ত করতে চান
শিক্ষা বিভাগ বিলুপ্ত করার ধারণা প্রায় যত দিন ধরে সংস্থাটি বিদ্যমান, তত দিন ধরে রিপাবলিকানদের আলোচনায় রয়েছে। ১৯৮০ সালের নির্বাচনী প্রচারে রোনাল্ড রিগান এটি বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
রিপাবলিকানরা ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষানীতি কেন্দ্রীয়করণের বিরোধী। তারা বিশ্বাস করেন, এটি রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের হাতে থাকা উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা শিক্ষা বিভাগকে শিশুদের মধ্যে ‘জাগ্রত’ (উদার) রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের অভিযোগ এনেছে, বিশেষ করে লিঙ্গ ও জাতি বিষয়ক পাঠ্যসূচি নিয়ে।
এদিকে ট্রাম্পের মিত্ররা স্কুল বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়াতে চান, যাতে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবাররা সরকারি অর্থ ব্যবহার করে সরকারি স্কুলের বদলে বেসরকারি বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নিতে পারেন।
রক্ষণশীলদের মতে, শিক্ষার্থীদের ঋণ প্রদানের মতো শিক্ষা বিভাগের অন্যান্য কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের আওতায় থাকা উচিত এবং নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত।