বৃষ্টিতে নষ্ট কৃষকের স্বপ্ন

কৃষি
Spread the love

আমাদের জন্মভূমি নিউজ ডেক্স
রাজশাহীতে টানা তিন দিনের বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে তানোর, চারঘাট, পবা ও গোদাগাড়ী উপজেলায় আমন ধানের পাকা ও আধাপাকা গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। চাষীরা জানিয়েছেন আর মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই কর্তন করা হতো ধান। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যা থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এবং শুক্রবার সারারাতের টানা বৃষ্টি ও ঝড়ে ক্ষেতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু জমিতে জমে থাকা পানিতে শাকসবজি ও রবিশস্যের ক্ষেতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। এদিকে, বাগমারায় বৃষ্টিতে পান বরজ ডুবে যাওয়ার উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের নুর মোহম্মাদ (৫০) নামে এক পানচাষি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে সংবাদ পাওয়া গেছে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘন্টায় জেলায় ১৪ দশমিক ৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৯ কিলোমিটার। বৃষ্টি থাকতে পারে আরো দু’একদিন। রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহীতে চলমান বৃষ্টি রবিবার পর্যন্ত থাকতে পারে। গত ২৪ ঘন্টায় রাজশাহীতে ১৪ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সময়ের সাথে আবহাওয়ার উন্নতি হবে।’সরেজমিনে কয়েকটি আমন ধানের ক্ষেতে গেলে দেখতে পাওয়া পায়, গতকালের সারারাতের বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে বেশিরভাগ জমির ধান গাছ মাটিতে নূয়ে পড়েছে। ক্ষেতে পানি জমে থাকায় ধানের শীষগুলো পানিতে ধুবে আছে। কৃষকেরা জানিয়েছে এ অবস্থায় থাকলে সেগুলো শীষ চিটা হয়ে পঁেচ যাবে। তানোর উপজেলার কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, “ধান কাটা শুরু করার কথা ছিল এই সপ্তাহে। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে ক্ষেতের ধান মাটিতে পড়ে গেছে। শুকাতে না পারলে ধান পচে যাবে।” আরেক কৃষক জহুরুল হক বলেন, “আমরা নালা খনন করে পানি নামানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিক না থাকায় কাজ হচ্ছে না। আবার এই পড়ে যাওয়া ধান কাটতে বাড়তি শ্রমিক প্রয়োজন হবে।”
পবা উপজেলার নওহাটা মধূসূদনপুর এলাকার কৃষক মোস্তফা বলেন, “আমি ২ বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছিলাম। কিন্তু গতকালের বৃষ্টিতে জমির অর্ধেক ধান মাটিতে পড়ে গেছে। এখন এই অবস্থায় ধানের ফলনও কম পাবো। এতে করে আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হবো।” রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন,“এখন রবি মৌসুম কেবলমাত্র শুরু হয়েছে। অনেক জায়গায় কৃষকেরা শীতকালীন সবজি লাগানোর জন্য বীজ রোপণ করেছে, সেগুলো ক্ষেতে বৃষ্টির পানি জমে থাকলে পঁেচ যাবে। এছাড়াও পড়ে যাওয়া ধান কাটতে বাড়তি শ্রমিক প্রয়োজন হবে। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও পরামর্শ প্রদান করছি।” তবে রাজশাহীতে বৃষ্টির প্রভাবে যেভাবে ফসলের ক্ষতি হয়েছে, আবহাওয়া উন্নতি না হলে এবং ক্ষেতে পাানি জমে থাকলে কৃষকেরা মনে করছেন তাদের ফসলে বড় বিপর্যয় হবে। জমি থেকে পানি নিষ্কাশন না হলে ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বরেন্দ্র অঞ্চল প্রতিনিধি জানান, রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকার পাঁচন্দর গ্রামের কৃষক জামিনুর রহমান। তিনি ৮ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আমন চাষাবাদ করেছিলেন। অন্যসব বছরের চেয়ে চলতি বছর তার আমন ক্ষেতে ধান বেশ ভালই হয়েছিল। সোনালী রংঙে পাক ধরেছিল তার ক্ষেতের ধান। আর মাত্র ১০ থেকে ১২ দিন পরে ঘরে উঠবে তার সোনালী ফসল এমন স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। কিন্ত ঘূর্ণিঝড় মোন্থা প্রভাবে শক্রবার দিবাগত রাতের ঝড়ো হাওয়া ও অতি ভারি বৃষ্টিতে একদিনেই তার সোনালী স্বপ্ন মাটির সাথে নুয়ে পড়েছে। তার উপরে দিয়ে চলছে পানির স্রোত।
সকালে ক্ষেতের ধান দেখে তিনি পাগলের মত হয়ে গেছে। এমন সোনালী স্বপ্ন নুয়েপড়া পানির নিচে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়ে পাগলের মত শুধু পাঁচন্দর গ্রামের কৃষক জামিনুর রহমানের একাই নয়,রাজশাহী অঞ্চলের তানোর, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল রহনপুর নওগাঁর নিয়ামতপুর পোরশাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের হাজারো কৃষকের সোনালী স্বপ্ন একদিনেই শেষ হয়েগেছে। শক্রবার দিবাগত রাতে অতিভারি বৃষ্টিতে ক্ষতি শুধু আমন ধানই নয়, রাজশাহীঞ্চলে মোহনপুর বাগমারা তানোর উপজেলা শতশত পুকুর মাছ ভেসে গেছে। এছাড়াও এসব এলাকায় শীতে আগাম সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছে। এছাড়া সড়কের পাশে অনেক গাছ উপড়ে পড়েছে। কোন কোন এলাকায় সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অনেক উৎসুক জনতা জাল দিয়ে মাছ শিকার করছে। বরেন্দ্রে কৃষকেরা জানিয়েছে,গত ১০ বছরের মধ্যে কার্তিমাসে এতো ভারি বৃষ্টি কখনো হয়নি। এ কারণে কোন কৃষক বা মৎস্যচাষীরা প্রস্ততি নিতে পারেনি। এছাড়াও ক্ষেতের পানি নেমে গেলেও নতুন করে ধানে ফুতকি/কারেন্ট আক্রমন বেড়ে যেতে পারে। এতে কীটনাশক প্রয়োগে বাড়তি খরচে পড়বে কৃষকেরা। তাতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। অন্য দিকে ফলনও কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
মান্দা: কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে নওগাঁর মান্দা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আমন ধানসহ শীতকালীন সবজির ক্ষেতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত একটানা বৃষ্টিপাতে নিচু এলাকার ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সরিষা, ফুলকপি, আলু, পেঁয়াজের বীজতলা, গাঁজর ও অন্যান্য সবজির জমি। এতে স্থানীয় কৃষকরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়।
কৃষকেরা বলছেন, কার্তিক মাসের শুরুর দিকে আবহাওয়া ভাল থাকায় তারা জমিতে হালচাষ দিয়ে ফসল রোপণের প্রস্তুতি নেন। এরই মধ্যে জমিতে সরিষা, আলু, ফুলকপি, গাঁজর, মুলাসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ করা হয়েছে। পেঁয়াজের বীজতলাসহ মুড়িকাটা পেঁয়াজের চাষ করেছেন অনেকে। কিন্তু হঠাৎ করে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে শনিবার সকাল পর্যন্ত একটানা চলে এই বৃষ্টি। একই সঙ্গে ছিল হালকা বাতাস। এতে বিভিন্ন ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে যায়। জমিতে নুয়ে পড়েছে আধাপাকা আমন ধান। এরই মধ্যে মাঠের নিচু এলাকার আমন খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। শনিবার উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আমন ধানের খেতসহ কৃষকের সরিষা ও বিভিন্ন শীতকালিন সবজির খেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় এলাকায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ এবং গত তিন বছরে একদিনে সর্বাধিক বৃষ্টিপাত। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কার্তিক মাসে সাধারণত হালকা বৃষ্টি হয়, তবে এ বছরের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক।
চলতি মৌসুমে মান্দা উপজেলায় প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে স্বর্ণা-৫, ব্রি-৫১সহ বিভিন্ন জাতের আমন ধান চাষ হয়েছে। এছাড়া ৬০০ হেক্টর জমিতে সরিষা, ৬০ হেক্টরে ফুলকপি, ৮০ হেক্টরে আগাম আলু এবং ১৫০ হেক্টর জমিতে নানা শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টিতে অন্তত ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এনায়েতপুর গ্রামের কৃষক অমল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘২৫-৩০ বছরেও কার্তিক মাসে এত বৃষ্টি দেখিনি। প্রবল বৃষ্টিতে আমার কয়েক বিঘা জমির আমন ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।’ পশ্চিম নুরুল্লাবাদ গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল জানান, ‘ধান সবে পাকতে শুরু করেছিল। এখন গাছ নুয়ে পড়ে পানির নিচে গেছে। বোরোতে ক্ষতির পর এবারও লোকসান গুনতে হবে।’ উপজেলার হাজী গোবিন্দপুর, গাইহানা কৃষ্ণপুর, চককানু ও নবগ্রামসহ বিভিন্ন গ্রামে আলু, ফুলকপি, পেঁয়াজ, ক্ষীরাসহ নানা সবজির খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু স্থানে পেঁয়াজের বীজতলাও নষ্ট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শায়লা শারমিন বলেন, ‘হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিতে আমন ধান ও সবজি খেতের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন।’
আক্কেলপুর: হাঁটুসমান কাদা পানিতে নেমে একদল মানুষ মাটির নিচ থেকে তুলে নিচ্ছেন সদ্য রোপন করা ছোট ছোট আলু। কেউ মাটির নিচে হাত ঢুকিয়ে তুলছেন, কেউ কাদা সরিয়ে রাখছেন পাশের টিনের থালায়।
তাদের মুখে নেই কোনো অভিযোগ শুধু নীরবতা, মেনে নেওয়া এক বাস্তবতা। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার শ্রীকৃষ্টপুর মাঠে গিয়ে দেখা গেছে কৃষকদের এই নির্মম বাস্তবতা। এই দৃশ্য যেন এ বছরের কৃষক জীবনের প্রতিচ্ছবি। টানা কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে সদ্য রোপণ করা আগাম আলুর ক্ষেত। বৃষ্টির পানি জমে আলুর বীজ পচে যাওয়ার আশঙ্কায় এখন সেই আলুই তুলে নিচ্ছেন কৃষকরা। হয়তো কিছুটা বাঁচবে, নইলে সবই যাবে হারিয়ে। কৃষকরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং জমির পানি দ্রুত না নামলে আগাম জাতের আলু চাষে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।
শনিবার উপজেলার শ্রীকৃষ্টপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক সমাজ হোসেন এবার দুই বিঘা জমিতে গত আট দিন আগে আগাম আলু রোপন করেছিলেন। কিন্তু ভারি বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে তার আলু ক্ষেত। তিনি হাঁটু পানিতে তার বাবাসহ কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে রোপন করা আলু পানির নিচ থেকে তুলে নিচ্ছেন। একই চিত্র দেখা গেছে ভদ্রকালী মাঠেও। সেখানে কৃষক বেলাল হোসেন তার স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে জমিতে রোপন করা আলু তুলে নিচ্ছেন। তিনি জানান, প্রচন্ড বৃষ্টিতে আলু ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। রোপন করা বীজ আলু জমিতে রাখলে পঁচে যাবে। এ জন্য তিনি কিছুটা ক্ষতি পোষাতে কাদা থেকে আলু গুলো তুলে নিচ্ছেন। উপজেলা কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আক্কেলপুর উপজেলায় আগাম জাতের আলু রোপণ হয়েছে ৫ শত ১৩ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন।
শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের কৃষক মোকলেছুর রহমান বলেন, আমি গত আট দিন আগে ২ বিঘা জমিতে আগাম আলু রোপন করেছিলাম। গত কয়েকদিনের একটানা বৃষ্টিতে আলুর জমিতে হাটু সমান পানি জমে গেছে। পানির নিচে থাকলে রোপিত আলুর বীজ পচে যাবে। তাই তুলে নিচ্ছি। যদি কিছুটা ক্ষতি পোষানো যায়।
একই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন পৌর এলাকার আলু চাষি রিফাতুল হাসান। তিনি বলেন, এবার ভালো দামে বিক্রির আশায় ৬ বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছিলাম। কিন্তু অসময়ে হঠাৎ এমন বৃষ্টিতে আমার আলু তলিয়ে গেছে। এতে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় করছি।
কথা হয় আরেক আলু চাষী আব্দুর রাজ্জাকের সাথে। তিনি বলেন, সব সময় আমরা কৃষকরা ক্ষতির মধ্যেই থাকি। গত মৌসুমে আলুতে ব্যাপক লোকসান হয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় চার লক্ষাধীক টাকার ক্ষতি হয়েছে। এবার লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে ঝুঁকি নিয়ে আবারও আলু চাষে নেমেছি। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে রোপন করা বীজ পঁচে গিয়ে ক্ষতির আশঙ্কা করছি।
আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, গত কয়েকদিন থেকে এই এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় আলুর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের আমরা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের পরামর্শ দিচ্ছি। পানি দ্রুত নামিয়ে ফেলতে পারলে বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। ক্ষতি এড়াতে কিছু কৃষক রোপন করা আলু তুলে নিচ্ছেন।
গোদাগাড়ী : রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ঝড়ে বাড়িঘর গাছপালা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে এবং অবিরাম বৃষ্টি পানিতে তলিয়ে গেছে ধান ক্ষেত, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৮ টা থেকে অবিরাম বৃষ্টি শুরু হয় রাত সাড়ে ১১টার সময় হঠাৎ কয়েক মিনিটের ঝড়ে উপজেলার পিরিজপুর গ্রামে ১শ’ ঘরবাড়ি, দোকানপাঠ উড়িয়ে নিয়েছে এবং গাছপালা ভেঙ্গে নিমিশেয় লন্ডভন্ড করে দেয়।তার মধ্যে প্রায় ১০/১২টি পরিবার একেবারে নিঃষশো হয়ে গেছে। মাঠে বোরো ধান, ভুট্টা ও টমেটোর ক্ষতি হয়েছে। তবে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এদিকে পিরিজিপুর গ্রামের ঝড়ে বাড়িঘর গাছপালা লন্ডভন্ড হলেও অবিরাম বৃষ্টিতে রিশিকুল, পাকড়ি ও গোদাগাড়ী ইউনিয়নসহ বেশ কিছু এলাকায় বোরো ধান পানিতে তলিয়ে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি অবিরাম বৃষ্টিতে ধান ক্ষেত তলিয়ে গেলেও গোদাগাড়ীতে ওয়াসার পাইপ লাইনের কাজ চলায় বিল থেকে ঠিকমত পানি বের হতে পারছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাতে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়। এ ঝড় স্থায়ী ছিল মাত্র ১ থেকে ২ মিনিট। এ সময় ঝড়ের তাণ্ডবে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রবল বাতাসে উড়ে গেছে ঘরের চালা, ভেঙ্গে গেছে দেওয়াল। নষ্ট হয়েছে ঘরে রক্ষিত খাদ্য সামগ্রী। লন্ডভন্ড হয়েছে ঘরের আসবাবপত্র। ছোট-বড় অসংখ্য গাছপালা উপড়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালনের তার ছিঁড়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। ভেঙে গেছে বিদ্যুতের খাম্বা। রাস্তায় গাছ পড়ে বন্ধ রয়েছে যান চলাচল। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বসবাস করছে খোলা আকাশের নিচে। বোরো ধানের ক্ষতি হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
পিরিজপুর গ্রামের ঝড়ে ঘরবাড়ি ও দোকানপাঠ উড়িয়ে নেওয়া পরিবার গুলো জানায়, রাতে ঝড়ে ঘরবাড়ির টিন উড়িয়ে নিয়েছে, দেওয়াল ভেঙ্গে তারা প্রায় নিঃষশো হয়ে গেছে। খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হবে। এছাড়াও গাছপালা ভেঙ্গে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
পিরিজপুর গ্রামের গ্রামের বাসিন্দা টেবলু বলেন, রাতে হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দ করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি উড়িয়ে নিয়া যায়। গাছপালা ভেঙে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। বর্তমানে পরিবার পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, মাটিকাটা ইউনিয়নের ধানের কিছু গাছ হেলে পড়েছে। তবে ধান প্রায় পরিপক্ষ হয়ে গেছে, কিছু দিনের মধ্যে ধান কাটা হতো। ধানের হালকা ক্ষতি হতে পারে। যে সকল ভুট্টার বীজ বপন করা হয়েছে গাছ বের হয়নি তার সামান্য ক্ষতি হতে পারে। টমেটো গাছের ডাল মাটিতে পড়ে গেছে সেগুলো মাটি শুকালেই ঠিক হয়ে যাবে। অগ্রিম লাগানো যে গাছে ফুল এসেছিল সেগুলোর সামান্য ক্ষতি হতে পারে। ফল কয়েকদিন দেরিতে পাবে।
পিরিজপুর ৪ নং ওয়ার্ডেও ইউপি সদস্য তোতা বলেন, ঝড়ে এক শতাধিক পরিবারের বাড়িঘর ও গাছপালা ভেঙে গেছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ঝড়ের তাণ্ডবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। তবে ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ ১২ টি পরিবারকে ইউনিয়ন পরিষদেও পক্ষ থেকে নগদ অর্থ সহায়তা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারের তালিকা তৈরি করে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হবে।
তানোর: বৈরী আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে রাজশাহীর তানোরে আমন মৌসুমের পাকা ধানগাছ পড়ে গেছে। শত শত পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, অনেক এলাকায় মাটির বাড়ি ভেঙ্গে পড়েছে। বাড়ি ঘর হারিয়ে অনেকে খোলা আকাশের নিচে রয়েছে। সেই সঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়েছে শীতকালীন আগাম শাকসবজি ও অন্যান্য রবি ফসল।
শনিবার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে হঠাৎ শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে অনেক আমনক্ষেতের পাকা ও আধা-পাকা ধানগাছ মাটিতে পড়ে গেছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে শত শত পুকুরে মাছ ভেসে গেছে, ছোট বড় অনেক বাড়ি পড়ে গেছে।
তানোর পৌর এলাকার হঠাৎ পাড়া গ্রামের রাসেদা বিবি মাটির বাড়ি অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ভেঙ্গে পড়ে গেছে। রাসেদা বলেন, আমি তানোর বাজারে ডিম বিক্রি করে সংসার চালায়। বাড়ি ভেঙ্গে পড়ে গেছে। কিভাবে আমি বাড়ি ঠিক করবো। খোলা আকাশের নিয়ে ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে আছি। পাঁচন্দর ইউনিয়নের যোগীশো আদিবাসিপাড়ার মহান হাসদা, সেতাবুরের বাড়ি ভেঙ্গে পড়ে গেছে। এরকম উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের ছোট বড় অনেক বাড়ি পড়ে গেছে এবং রাস্তার উপর দিয়ে পানি প্রভাহিত হচ্ছে।
তানোর পৌর এলাকার গোল্লাপাড়া গ্রামের কৃষক আজগর আলী, রিয়াজ, বাবু, হাতেম মন্ডল বলেন, ঝড় ও বৃষ্টির কারনে পাকা ধান মাটিতে পড়ে গেছে। গতবার আলু নিয়ে কৃষকরা পথে বসেছে। এবার ধান নিয়ে কি না জানি হয়। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে তানোর উপজেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২২ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাত ২৮ হেক্টর, উফশী জাত ২২ হাজার ১১৭ হেক্টর এবং দেশি জাতের ধান চাষ হয়েছে ৫৫০ হেক্টর জমিতে।
তানোর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা নাঈমা খান বলেন, আমি বিভিন্ন স্থান থেকে খবর সংগ্রহ করেছি। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকার ঘর বাড়ি পড়ে গেছে, জমির ধান নষ্ট হয়েছে, অনেক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। গরীব অসহায়দের সহায়তা করার জন্য উপজেলা প্রশাসন সব সময় পাশে থাকবে।
নওগাঁ: গতবছর আলু চাষ করে লোকসানে পড়ে নওগাঁর কৃষকরা। সেই লোকসান পুষিয়ে নিতে আগাম আলু চাষ শুরু করেন তারা। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কয়েদিনের বৃষ্টিতে ফসলি জমিতে পানি জমে। যেসব জমিতে আগাম আলু বপণ করা হয়েছে, সেসব জমিতে পানি জমে থাকায় রোপণ করা আলুর বীজ পচে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। যে কারণে আলু চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এছাড়াও রোপা আমন ধান ও আগাম শীতকালীন শাক-সবজি ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, জেলায় আমন ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টর জমিতে। আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে ১ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমিতে। আলু চাষের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার হেক্টর জমিতে। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আলু আবাদের জন্য কোথাও কোথাও প্রস্তুত করা হয়েছিল জমি, কোথায় সদ্য রোপণ করা হয়েছে বীজ। বৃষ্টিতে জমিতেই জমেছে পানি। ফসল বাঁচাতে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। শুধু আলু খেত নয়, আগাম জাতের শীতকালী ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মরিচ, বেগুন, মুলাসহ বিভিন্ন শাক-সবজির গাছও মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। যেসব খেতের সবজি এখনো ভালো রয়েছে, তা রক্ষায় প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষকেরা। এছাড়াও মাঠের আধা-পাকা ধান হেলে পড়েছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে পানিতে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গেলো বছর আলুর ভালো দাম না পাওযায় এবছর ভালা লাভের আশায় আগাম আলু চাষ শুরু করেন তারা। তবে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে আলুর জমিতে পানি জমে। ফলে বৃষ্টির পানিতে একদিকে রোপণকৃত বীজ পচে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা। অন্যদিকে অনাবাদী জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের পর বীজ রোপণ কবে করা যাবে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। শীতকালীন শাক-সবজির জমিতেও দেখা দিয়েছে শিকড় পচে যাওয়ার। পানি দ্রুত না সরলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকেরা। আত্রাই উপজেলা কালিকাপুর ডাঙ্গাপাড়া এলাকার কৃষক জয়নাল জানান, ‘গতবছর আলু চাষ করে অনেক লোকসান হয়েছে। ভাবলাম একটু আগাম আলু লাগালে ভালো দাম পাওয়া যাবে। সেই আশায় দেড় বিঘা জমিতে আলু বীজ রোপণ করে এক সপ্তাহ হয়নি। এরমধ্যে বৃষ্টি। এখন বৃষ্টির পানি জমে থাকায় গাছ ঠিক মতো উঠতে পারে নাও পারে। কি করব ভেবে পাচ্ছি না।’
মান্দা উপজেলার ভারশো এলাকার কৃষক আশরাফ হোসেন বলেন, ‘আগাম আলু চাষে কিছুটা ঝুঁকি থাকে। এলাকার কয়েকজন আলু লাগাইতাছে দেখে আমিও এক বিঘা জমিতে কয়েকদিন আগে লাগালাম। কয়েকদিনের থেমে থেমে বৃষ্টি হওযায় আলুর জমিতে পানি জমে। এতে করে রোপণকৃত বীজ পচে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।’ সদর উপজেলা বর্ষাইল এলাকার কৃষক রতন মোল্লা বলেন, ‘সবেমাত্র কিছুদিন আগে আলুর বীজ রোপণ করেছি। এরই মধ্যে বৃষ্টি। এখনও মাঝে মাঝে মেঘে ঢেকে আসছে। ঝির ঝির করে বৃষ্টিও পড়ছে। মাটির নিচে রোপণ করা আলুর বীজ একটু পানি পেলে পচে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্ষেত্রের অধিকাংশ আলু পচে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হোমায়রা মন্ডল বলেন, ‘বৃষ্টি হলেও ভারী বর্ষণ হয়নি। সবেমাত্র আলু রোপণ শুরু হয়েছে। যেসব জমিতে আলু লাগিয়ে ৮-১০ দিন হয়েছে সেগুলোর ক্ষতি হবে না। এছাড়া শীতকালীন সবজি ও ধানের খুব বেশি ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। ধানের জন্য বৃষ্টি কিছুটা আর্শীবাদ। খেত থেকে পানি সরে গেলে কোন সমস্যা হবে না।’
নিয়ামতপুর: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁর নিয়ামতপুরে রাতভর ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আমন ধান ও রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাতভর হালকা ও মাঝারি বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়া আমন ধান নূয়ে পড়েছে। শুক্রবার দিবাগত রাতের বৃষ্টিতে উপজেলার নিচু আমন ধানের ক্ষেতগুলো পানির নীচে তলিয়ে যায়। নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৩০ হাজার ৪০৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষাবাদ হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে উপজেলায় শতাধিক হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয় নি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে কৃষি অফিস থেকে সহযোগিতার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি অফিস বলছে, যেসব জমিতে আমন ধান লাল বর্ণ ধারণ করেছে সেই জমিগুলোতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করতে হবে। যেসব ধানের শীষ বের হওয়ার উপক্রম হয়েছে সেসব জমিতে রসের ঘাটতি পূরণ হবে। নূয়ে পড়া জমিতে বাদামী গাছ ফড়িং এর আক্রমণ দেখা দিলে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। এ বছর আমনের বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টিতে রবিশস্যের চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উপজেলার শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা এবাদুল মন্ডল বলেন, ১ বিঘা জমিতে ক্ষীরা রোপন করেছি। হঠাৎ বৃষ্টিতে আমার ক্ষেতের সব ক্ষীরা গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এদিকে বৃষ্টির সাথে হালকা ঝড়ো হাওয়া আমন ধান নূয়ে পড়ছে। আরেক আলু চাষি সাইদুর রহমান বলেন, আমি তিন বিঘা জমিতে আগাম জাতের আলুর বীজ রোপন করেছি। কিন্তু আলুর ক্ষেতে এখন পানি জমে আছে। এ কারণে আলু বীজ নষ্ট হওয়ায় আশঙ্কা করছেন তিনি। আমন ধান চাষি মজনু মিয়া বলেন, আমি এবার ৩ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষাবাদ করেছি। নিচু এক বিঘা আমন ধান পানিতে ডুবে গেছে।
আরেক আমন ধান চাষি কামরুল হাসান বলেন, আমি ১৪ বিষা জমিতে আমন ধান চাষ করেছি। জমির ধান ইতোমধ্যে পেকে গেছে। ধান কাটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। রাতভর বৃষ্টি ও হালকা ঝড়ো হাওয়ার কারণে সব ধান নূয়ে পড়েছে। নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি অফিসার রফিকুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমনের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। গত রাতে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে নিচু জায়গার জমিগুলো পানি জমে গেছে। তবে বিকেলের মধ্যে পানি নিষ্কাশন হবে। নিচু এলাকায় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমনের ফলনে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না।
বাগমারা: রাজশাহীর বাগমারা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঘুর্ণিঝড় মোন্থা’র প্রভাবে অসময়ে প্রচুর বৃষ্টিতে মাঠ-ঘাটে ফসলের জমিতে পানি থৈ-থৈ করছে। বুধবার বিকাল হতে শনিবার পর্যন্ত এলাকায় দফায় দফায় হালকা বৃষ্টি হলেও শুক্রবার দিবাগত রাতে কার্তিকের মাঝামাঝিতে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিতে এক রাতে এলাকার কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। অতি বর্ষনে মাঠ-ঘাট ডুবে রবি মৌসুমের উড়তি রোপা-আমন ধান, রোপনকৃত পিঁয়াজ, সরিষা, পানবরজ, মরিজ, বেগুন, শিম সহ নানা ফসল ও পুকুর ভেসে মৎস্যচাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
ক্ষতির পরিমান সইতে না পেরে উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের নুর মোহম্মাদ (৫০) নামে এক পানচাষির অকাল মৃত্যু হয়েছে। নুর মোহমামাদ নন্দনপুর বড়পুকুর এলাকার মৃত মানিকুল্লার ছেলে। জানা যায়, কার্তিক-অগ্রায়নে রবি মওসুমে ফসল উৎপাদনের উপযুক্ত সময়। এ সময়ে জমি চাষ দিয়ে সরিষা, পেঁয়াজ, আলু বপনের উপযুক্ত সময়। কিন্তু হঠাৎ করে ঘুর্ণিঝড় মোন্থা’র প্রভাবে বৃষ্টিতে চাষকৃত জমিতে পানি বেঁধে বীজ নষ্ট হয়ে পড়েছে। এছাড়া খড়ের জন্য জমিতে ধান কেটে রাখা ধানের উপরে পানি বেঁধে খড় নষ্টের পাশাপাশি ধান নষ্ট হয়েছে। শনিবারের রাতের পানিতেই ফসলের ক্ষতির সাথে মাঠ-ঘাট ডুবে অন্য ফসলের সাথে ভিটা জমির পানবরজ ও পুকুরের মাছ ভেসে একাকার হয়ে পানি থৈথৈ করছে। বর্ষনে ফসলের জমিতে মাজা পরিমান পানি জমে গেছে। এছাড়া মৌসুমের রোপা-আমন ধান মাঠে ডুবে পচে গেছে। বালানগর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম, আনছার আলী ও ফসির উদ্দিন জানান, সরিষা বপনের উপযুক্ত সময় পেয়ে সরিষা ৫/৬ দিন আগে রোপণ করা হয়। কিন্ত বপনের পরের দিন হতে বৃষ্টিতে জমির বপনকৃত সরিষায় পানি বেধেঁ গেছে। পানি বাধাঁর কারণে ওই জমির সরিষা নষ্ট হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন তারা।
একই ভাবে গ্রামের বয়েন, হাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন কৃষক জানান, তাদের বাড়িতে গরু পালনের কারণে খড়ের প্রয়োজন। খড় শুকানের জন্য রোপা-আমন ধান কেঠে মাঠে রেখেছেন। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নামায় তাদের খড়সহ ধান নষ্ট হয়ে পড়েছে। এছাড়া উড়তি নামলা আমন ধান পানিতে ডুবে গেছে। গ্রামের এনামুল হকের পানবরজ অতি বর্ষণে মাটির সাথে লুটে পড়েছে। এমই লাগানো পিঁয়াজে মাঠে মাঠে পানির নিচে রয়েছে। গণিপুর ইউনিয়নের একডালা গ্রামের আমিনুল ইসলাম, সাবল হোসেন, আব্দুল করিমসহ বেশ কয়েকজন পানচাষিদের পান বরজ ডুবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে পান বরজে শনিবার সকালে গিয়ে মাজা পরিমান পানি জমা ও ক্ষতির পরিমান সইতে না পেরে নন্দনপুরের নুর মোহম্মাদ নামে এক কৃষকের অকাল মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এ ব্যাপারে বাগমারা উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, হঠাৎ করে বৃষ্টিতে বপনকৃত ফসলের ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, অসময়ে বৃষ্টিতে শাক-সবজি, মরিজসহ বেশ কিছু ফসলচাষিরা লাভবান হবার কথা থাকলেও প্রচুর পরিমান বৃষ্টিতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *